সময়ের জলছবি

সময়ের জলছবি
ছবি সংগৃহীত

ইতিহাস কাউকেই কিছু শেখায়না। বাঙালিকে তো নয়ই। বৈদিক ও পরবৈদিক সভ্যতায় পাত্তা না পাওয়ার অপমান ভুলে, মাৎস্যন্যায় কাটিয়ে উঠে, বর্গী হাঙ্গামা পর্ব শেষ করে, উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদের নিষ্ঠুরতার বলি হতে হতে, ঠগী দস্যুদের উৎপাত পার হয়ে, পলাশীর যুদ্ধের আগে ও পরে কাঠিবাজির ইতিহাস গড়তে গড়তে ও ভাঙতে ভাঙতে কম পথ তো পেরোয়নি। তাতে কী? ডিলানের প্রশ্নের কোনও উত্তর বাঙালির কাছে নেই হে। পাঁচশো, সাতশো, হাজার বছর হেঁটে, সময় ঘড়ি মণিবন্ধে অক্লেশে থেমে থাকে পঞ্চাশ-একশো বছর। দম দেবার জন্যে কালেভদ্রে এক-আধজন শ্রীচৈতন্য, রামমোহন, রামকৃষ্ণ, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, জগদীশ বসু বা প্রফুল্লচন্দ্র আসেন বটে। কালের নিয়মে চলেও যান। সময়ের ঘড়িটা মণিবন্ধে রয়েছে জেনেই বাঙালির সন্তুষ্টি। তাকে সচল রাখার দায় মোটেই নেই। বাঙালির আত্মহত্যার প্রবণতা আসলে জিনগত।

ক্লাইভের সঙ্গে করমর্দন করে কীভাবে পরাধীন হতে হয় – বাঙালি জানে। বিদ্যাসাগরের মাথায় রাতের অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়তে বাঙালি ছাড়া কেই বা পারতো! রবীন্দ্রনাথ, সুভাষ বোস যাঁদের নাম ধোয়া জল খেয়ে একটা অপদার্থ জাতি বেঁচে থাকে, তাঁদের জীবদ্দশায় কী হাল করে ছেড়েছিলো, ভাবলে হাসি পায়। এ এক অদ্ভুত অসুখ। বর্তমানকে শুধরে নেবার দায় নেই! ভবিষ্যতের কথা ভাবার স্বপ্নপ্রবণতা নেই! শুধু অতীতের দিকে চেয়ে চেয়ে হা হুতাশ করা। যে বিলাপের শব্দে বর্তমানে আকাশ বাতাস চমকিত। যে বিলাপ না শোনবার আপ্রাণ চেষ্টায় কবি, সাহিত্যিক, সিনেমা-নাটক সৃষ্টি করিয়ে, ছবি আঁকিয়েদের একটা অংশ। যে বিলাপ এখন শুনতে পান এবং সঙ্গে ভয়টাও পান বাঙালির একটা বড় অংশ। তারমধ্যে বুদ্ধিজীবী থেকে নির্বুদ্ধিজীবীরাও আছেন। আর ছোট, কিন্তু দূরবীন না নিয়েও দেখা যায় এমন দলভুক্তের সংখ্যা কিন্তু বাড়ছে ক্রমেই।

এখন স্পষ্ট করেই বলা যাক। বিপদটা কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তটা কিন্তু বাঙালির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সেটা প্রমাণ হয়ে হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। অনেকেই এটা বলার জন্য প্রস্তুত, কুড়ি বছর আগে বাঙালি কি তাহলে সুখে ছিলো ভালো ছিলো না কি? স্থানীয় স্তরের নেতাদের কথাই আইন হয়ে গেছিলো প্রায়। রান্নাঘর ভাড়ার ঘর, শোবার ঘর – সর্বত্রই তাঁরা নিজ দায়িত্বে প্রবেশ করে চলেছিলেন এবং আস্ফালনও তো কম কিছু ছিলোনা। তাঁদের হাত থেকে বাঁচবার জন্যই তো বাঙালি দু হাজার এগারো সালের তেরোই মে ... ইত্যাদি ইত্যাদি। দাঁড়ান মশাই। ঠিক এইখানেই থামাবো। এঁদের তৈরি করেছিলেন তো সোনার বাংলার দুধ ছানা খেকো অমেরুদণ্ডী বাঙ্গালিই। ভূমি সংস্কারের সুফল ভোগ করে শিল্পায়নের দিকে যাবার পথটুকু তো সকলে মিলেই খোঁজা দরকার ছিলো। তা না করে একটি বিরাট ষড়যন্ত্রের জালে সাধে আহ্লাদে জড়ালো একটা জাতি।

ফলে যা ঘটলো সেটা ভয়ানক। ক্ষমতা চলে গেল কাদের হাতে? যাঁদের সাংগঠনিক কোনো বোধ নেই, ন্যূনতম শিক্ষা নেই, সংবেদনশীলতার ছিটেফোঁটা নেই চরিত্রে। মাথা থেকে পা অবধি নিম্নমেধা আর মেধাহীনতার চাষ। যার গলায় এতটুকু সুর নেই, যার কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণ সুন্দর নয় তাঁকে গান গাইতে অনুরোধ করলে তিনি বিব্রত হন; যিনি রঙ তুলির ব্যবহার জানেন না এবং আঁকতে পারেন না তাঁকে আঁকতে বললে তিনি কুণ্ঠিত হবেন ও প্রত্যাখ্যান করবেন; যিনি কবিতার কিস্যু বোঝেন না, শব্দের ব্যবহার, অন্ত্যমিল, বাক্যগঠন ও ভাবপ্রকাশ সম্পর্কে যার কোনো ধারণা নেই তিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশের জন্য কবিতা লিখলেও সেটা লুকিয়ে রাখবেন; যিনি ভালো রাঁধিয়ে নন, তিনি অতিথিকে রেঁধে খাওয়াতে তত উৎসাহী হবেন না; যার রাজনৈতিক পড়াশুনো নেই তিনি তত্ত্বকথা আওড়াবেন না; - এই সবই ছিলো প্রথা। তেমনটাই হবার কথাও। কিন্তু হল কী? কী হচ্ছে সেটা নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিন। তবে এটাও ঠিক যে বৌদ্ধিক এবং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের ফল হাতে নাতে পাওয়া যায়না। সময় লাগে। অর্থাৎ বলতে চাইছি, চারদিনে দুগগাপুজোর দীর্ঘদিনের চল। তাকে টেনেটুনে দশদিন করে দিলে অথবা মূর্তির চোখ আঁকার কোমরবাড়ির রীতিকে গুলিয়ে পুরোহিতের ‘চক্ষুদান’ নামক পূজানুষ্ঠানের সঙ্গে গুলিয়ে দিলে বা অর্থহীন কিছু বেসুরো গানে বাধ্যতামূলকভাবে পাড়ার মণ্ডপে মণ্ডপে রোজ কান ঝালাপালা হয়ে গেলেও ভাতের থালায় টান পড়বে না বা প্রাত্যাহিক জীবন থেমে যাবে না। এই অবক্ষয়ের ঠেলা টের পেতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। কিন্তু পাড়ার ক্লাবে যখন পাশের পাড়ার ক্লাবের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যে অস্ত্রের গুদাম তৈরি হয়, সেটা অশনিসংকেত। যখন সরকারি প্রশ্রয়ে মদ্যপ হতে থাকে সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ থেকে কলেজ পড়ুয়া, সদ্য বেকার ও প্রৌঢ়ত্বে পা দেওয়া মানুষজন, তখন আমাদের ঘরের মেয়েটি রাত করে টিউশন পড়ে বাড়ি ফেরার পথে আর নিরাপদ থাকেনা। যখন গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর সিন্ডিকেটের জন্য লড়াই বাধে তখন কোনও পথচারীই আর নিরাপদ থাকেনা। যখন রাজনৈতিক নেতা থেকে জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ী(!)দের লক্ষ্য হয়ে পড়েন তখন আপনার আমার ঘরবাড়ি, রাস্তার ফলওয়ালা, মিষ্টি কিনতে বেরোনো শিশুটি বা তার মা, কেউই আর বিপদসীমার বাইরে থাকছেন না। যখন রাস্তার এপারের সঙ্গে ওপারের গুলির লড়াই চলছে প্রকাশ্যে, তখন স্কুল ফেরত ছাত্রটির বেঁচে বাড়ি ফেরার নিশ্চিন্ততা থাকবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। যখন অশিক্ষিত রাজনৈতিক নেতা অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে গুড় জলের নিদান দেন তখন গণতন্ত্রের ঢাক তো ‘চড়াম চড়াম’ করে বাজবেই। স্কুলে উর্দুর শিক্ষক যাবেন না বাংলার শিক্ষক, এই নিয়ে গুলি চলতে থাকলে তো বইয়ের পাতা রক্তাক্ত হবেই। বিপদটা আসলে এখানেই। কোথাও কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকছে না।

তাহলে! ভবিষ্যতের কথা ভাবার দায় যাঁদের নেই তাঁদের বাদ দিয়ে রাখছি। এই ব্যবস্থায় শ্রম ব্যাতিরেকে জাদু অর্থ যাঁদের পকেটে এবেলা ওবেলা আসছে তাদেরও বাদ দিয়ে রাখলাম। যারা হাত পেতে ছিটেফোঁটা ভিক্ষার প্রত্যাশায় থাকছেন, স্বাভাবিকভাবে তাঁরাও বাদ। যারা শিক্ষাহীন, চেতনাহীন অন্ধকার পৃথিবীকে আরও দীর্ঘ করার জন্য এই অবস্থাকে যে কোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখবেন তাঁদেরকে তো বাদ দিয়ে রাখতেই হবে। কিন্তু যাঁদের বিবেক আছে, শিক্ষা আছে তাঁরা? যারা এই অবস্থায় বীতশ্রদ্ধ! যারা ভোট দিতে গিয়ে বাধা পেয়ে বাড়ি ফিরে রাগে ফুঁসছেন? ছেলেমেয়েদের কলেজে ভর্তি হবার জন্য ঘুষ দেবার টাকা যাঁদের নেই অথবা থাকলেও দিতে গিয়ে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় তাঁরা? যারা প্রত্যেকদিন খবরের চ্যানেল খুলে দুটো গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে খুন, তিনটে প্রকাশ্যে গুলি, এক আধটা ধর্ষণ, দু একটা ব্রিজ ভেঙ্গে মানুষের থেঁতলে যাওয়া দেখে ভাবেন, আর খবর দেখা যাবেনা, তাঁরা? মেয়ের কর্মস্থল বা পড়া থেকে ফেরার দিকে উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে থাকেন যেসব বাবা মায়েরা! তাঁরা? দিনের পর দিন বেকার মেয়ে বা ছেলের হতাশা দেখতে দেখতে যাঁদের নিজেদেরই জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে গেলো, তাঁরা?

দায়িত্ব আসলে তাঁদেরই। অতীতের ভুল যে জাতিকে সংশোধনের পথ দেখাতে পারেনি, ভবিষ্যতের পথ তাঁরা অন্তত খুঁজুক এবারে। সময় আগত।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in