শতবর্ষে মোপালা বিদ্রোহ

উনিশশো একুশ সালের আগস্ট মাস। সময়টা একশো বছর আগে। মালাবার অঞ্চল উত্তাল হয়েছিল কৃষক বিদ্রোহে। বিদ্রোহ করেছিল মোপালা কৃষকরা। জমিদারদের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ শুরু হয় ২০ আগস্ট।
শতবর্ষে মোপালা বিদ্রোহ
মোপালা বিদ্রোহের বন্দীদের বিচারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছেছবি সৌজন্য - দ্য হিন্দু আর্কাইভ

উনিশশো একুশ সালের আগস্ট মাস। সময়টা একশো বছর আগে। মালাবার অঞ্চল উত্তাল হয়েছিল কৃষক বিদ্রোহে। বিদ্রোহ করেছিল মোপালা কৃষকরা। জমিদারদের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। বিদ্রোহ শুরু হয় ২০ আগস্ট। ২০২১ সালের ২০ আগস্ট ভারতের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসের সেই স্মরণীয় অধ্যায়ের শতবর্ষ পূর্ণ হলো।

ধর্মীয় বিচারে মোপালারা ছিলেন মুসলিম। যাদের দশকের পর দশক শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল মোপালা কৃষকরা। সেই জমিদাররা ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু, মূলত জেনমি সম্প্রদায়ের। তাই শোষণ-অত্যাচারের বিরুদ্ধে এই শ্রেণি-লড়াইকে খুব সহজেই হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের লড়াই আক্রমণ বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয় এবং ইংরেজরা এই সাম্প্রদায়িক ভাষ্য তৈরি করতে কিছুটা সফলও হয়েছিল।

মালাবারে তখন ইংরেজ শাসন, যদিও পার্শ্ববর্তী ত্রিবাঙ্কুর ছিল করদ রাজ্য। বিদ্রোহ জমিদারদের বিরুদ্ধে হলেও মোপালা কৃষকদের কাছে এটা অজানা ছিল না যে, শোষণ অত্যাচারের প্রতিটা ক্ষেত্রে ইংরেজ প্রশাসন শুধু নীরবই থাকত না, জমিদারদের সমর্থন জোগাতো, তাদের সহযোগী হতো।

ইংরেজদের এতে অবশ্যই স্বার্থ ছিল। কেননা কোষাগার স্ফীত করতে গ্রামীণ ভারতে তাদের মূল ভরসা ছিল এই জমিদাররা। তাই জমিদারদের বাড়ি, শস্যভাণ্ডারের সাথেই কৃষকদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল সরকারি দপ্তর, ট্রেজারি, পুলিশ চৌকিও। আর ১৯২১ সালেই মোপালাদের সঙ্গে জমিদারদের প্রথম সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল তা নয়, আগের শতকে ২২ বার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে; যার মধ্যে ১৮৪১ এবং ১৮৪৯ সালে সংঘর্ষ ভয়ংকর আকার নিয়েছিল। আর পূর্বের ওই সব ঘটনায় ইংরেজ প্রশাসনের ভূমিকা স্মরণে ছিল মোপালা কৃষকদের। এই উভয় শক্তিই যে শত্রু এটা তাদের ভালভাবেই উপলব্ধিতে ছিল। জমিদার ও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত এই কৃষক বিদ্রোহে স্বাধীনতার আগে যেমন সাম্প্রদায়িকতার রঙ লাগানো হয়েছিল, স্বাধীনতার পরেও সেই অপচেষ্টা যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। সম্প্রতি সময়ে তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সেদিকে আলোকপাত আমরা পরে করব।

মোপালারা ছিলেন মূলত কৃষিজীবী; ক্ষুদ্র কৃষক, জমিদারের জমিতে ভাড়া দেওয়ার বিনিময়ে চাষ করতেন। খুবই সামান্য সংখ্যক মোপালা ব্যবসাবাণিজ্য করতেন। মালাবারে এই চাষের জমি ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা একেবারেই মোপালাদের পক্ষে ছিল না। কোনো আগাম জানানো ছাড়াই যখন খুশি জমি থেকে উৎখাত করতে পারত জমিদারেরা। জমিতে চাষ করার জন্য কৃষকদের যে অর্থ দিতে হতো তার পরিমাণও ছিল যথেষ্ট বেশি। মাঝেমাঝে আবার তা বাড়ানো হতো। কোনো নিয়মকানুন মেনে এই বৃদ্ধি ঘটত না। সম্পূর্ণ জমিদারের মর্জির ওপর তা নির্ভর করত। জমিদাররা জোরজবরদস্তি এই অর্থ আদায় করত। পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো লাভ হতো না, উল্টে তারাই এই জোরজবরদস্তি আদায়ে সঙ্গত করত। এর সাথে ছিল বিভিন্ন কর।

১৮৩৫ সাল থেকে মোপালাদের ওপর জমিদার ও ইংরেজদের এই নিপীড়ন শুরু হয়। ১৯২০-২১ সালে এই জমির ভাড়া চড়া হারে বাড়িয়েছিল জমিদাররা এবং সেই অর্থ আদায়ে পুলিশের সাহায্যে ব্যাপক অত্যাচার চালায় জমিদারা। এতেই জমিদারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রতিশোধস্পৃহা পুঞ্জীভূত হচ্ছিল কৃষকদের মধ্যে। এটাই ফেটে পড়ে ১৯২১ সালের ২০ আগস্টের টিরুরানগাডিতে এক মসজিদের ঘটনায়।

ইরানাডু তালুকের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওই দিন মসজিদ তল্লাসিতে আাসে। পুলিশ আলি মুশালিয়ার নামে খিলাফত আন্দোলনের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। প্রচুর সংখ্যক মানুষ মসজিদের সামনে জড়ো হলেও তারা শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু পুলিশ সেই জনসমাবেশের ওপর গুলি চালায় এবং বেশ কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। এতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে জনতা। তারা সরকারি দপ্তরগুলিতে চড়াও হয়, ধ্বংস করে। পুড়িয়ে দেয় সমস্ত নথিপত্র। লুট করে ট্রেজারি। বিদ্রোহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এরানাডু, ভাল্লুভানাডু, কেজিকোড ও পন্নানি তালুকে। এসব জায়গায় জমিদারদের বাড়ি, শস্যভাণ্ডার আক্রমণের সাথেই বিদ্রোহী কৃষকরা পুলিশ চৌকি জ্বালিয়ে দেয়, ইংরেজ বাগিচা মালিকদের আক্রমণ করে।

মোপালা বিদ্রোহের মহান নেতা হলেন ভারিয়ন কুন্নাথু কুঞ্জাহাম্মদ হাজি বা ভি কে হাজি। এই লড়াইয়ের একটা বড়ো অংশে ইনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯২২ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশের গুলিতে হাজির মৃত্যু হয়। ভি কে হাজি’কে স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন শহিদ হিসেবেই কেরালার মানুষ স্মরণ করে। হাজির মৃত্যুর পরেই কৃষক বিদ্রোহের তেজ কমে আসে। ইংরেজ পুলিশ নৃশংসতার সাথে এই বিদ্রোহ দমন করে। ১৯২২ সালের প্রথম দিকেই ইংরেজরা এই বিদ্রোহ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে। সরকারি হিসেবে ২ হাজার ৩৩৭ জন বিদ্রোহী মারা গিয়েছিল। কিন্তু সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। পুলিশ নির্বিচারে বিদ্রোহীদের খুন করেছিল। বেসরকারি হিসেবে ১০ হাজারেরও বেশি বিদ্রোহী মারা গিয়েছিলেন। ৪৫ হাজার ৪০৪ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। কালিকট আদালতে এদের বিচার হয়।

হিন্দূত্ববাদীরা এখন মোপালা বিদ্রোহকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছে যা মুসলিমদের দ্বারা হিন্দুদের ওপর সংঘটিত হয়েছিল। মুসলিমরা হিন্দুদের গণহত্যা করেছিল, মন্দির ধ্বংস করেছিল, ধর্মান্তরিত করেছিল। এক আরএসএস নেতা আরও অগ্রসর হয়ে মোপালা বিদ্রোহীদের তালিবানদের সাথে তুলনা করেছে।

কিন্তু ইতিহাসে হিন্দুত্ববাদীদের কথার সর্মথন মিলছে না। ভি কে হাজি, আলি মুশালিয়ার মতো হিন্দু এম পি নারায়না মেনন, বি নামুপুথুরিপাদু'র মতো হিন্দু কংগ্রেস নেতাও এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মেনন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, বিচারে মাপিলা আইনে তাঁর ১৩ বছরের জেল হয়।

মালাবার অঞ্চলে ১৯২০ সালে কংগ্রেসের মানজেরি এবং ১৯২১ সালে ওট্টাপালম সম্মেলনে মোপালাদের বিষয়ে আলোচনা হয় এবং বিদ্রোহকে সমর্থন জানানো হয়। এই বিদ্রোহে যেমন বহু হিন্দু কৃষক অংশ নিয়েছিলেন তেমনই মুসলিম জমিদারদের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহীরা চড়াও হয়েছিলেন। আসলে মালাবার অঞ্চলে সেসময়ে মুসলিম জমিদারের সংখ্যা খুবই নগণ্য ছিল। বিদ্রোহীদের হাতে চেরুট্টি নামে এক মুসলিম পুলিশের হত্যার কথাও লিপিবদ্ধ আছে। যারাই জমিদার ও ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তাদের পক্ষ নিত; তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেছিল বিদ্রোহীরা। সম্প্রতি জানা গেছে, কোট্টাকলের বিখ্যাত আর্য বৈদ্য পি এস ভারিয়ার মোপালা বিদ্রোহে ৫০০ টাকা সাহায্য করেছিলেন।

মোপালা বিদ্রোহ যেমন জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়েছিল, একইসাথে তা ছিল উপনিবেশ শাসনবিরোধীও। তাই দেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে শুধু স্মরণীয় ঘটনা নয়, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসেও এক গৌরবজনক অধ্যায় মালাবারের এই মহান কৃষক বিদ্রোহ।

স্বাধীনতা আন্দোলনে কোনো অবদান নেই দেশের হিন্দুত্ববাদী শক্তির। জমিদারি ব্যবস্থার উচ্ছেদের সামন্ততন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের তারা নীতিগতভাবে বিরোধী। আজন্ম তারা ইতিহাসকে বিকৃত করার সংস্কৃতি লালনপালন করে আসছে। তাই তাদের কাছে মোপালা বিদ্রোহ নিয়ে এরকম ব্যাখ্যা অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরঞ্চ এটাই কাম্য ছিল। এই প্রেক্ষিতেই প্রগতিশীল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক এবং বামপন্হী মানুষদের কাছে এক জরুরি কর্তব্য হাজির হয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের এই গৌরবজনক ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়গুলির চর্চা তাঁদের আরও বাড়াতে হবে, দেশের মানুষের কাছে তা নিয়ে যেতে হবে।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in