CPIM: প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী প্রতিদিন নির্জলা মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছেন - মহম্মদ সেলিম

আলপথ দিয়ে, সাঁকোপথ দিয়ে আমরা জুড়তে চাইছি। যাদের দূরবীন দিয়ে দেখা যেত না তাঁদেরও এখন মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা বলেন সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।
সাংবাদিক সম্মেলনে মহম্মদ সেলিম
সাংবাদিক সম্মেলনে মহম্মদ সেলিম নিজস্ব চিত্র

আমরা মানুষের ঐক্য গড়ে তুলছি। মানুষের সংগ্রাম গড়ে তুলছি। আমরা একটা প্রজন্মের সঙ্গে আরেকটা প্রজন্মের সেতুবন্ধন করছি। আমরা মানুষে মানুষে মেলবন্ধন ঘটাচ্ছি। গ্রামের সঙ্গে শহরের মেলবন্ধন ঘটাচ্ছি। আলপথ দিয়ে, সাঁকোপথ দিয়ে আমরা জুড়তে চাইছি। যাদের দূরবীন দিয়েও নাকি দেখা যেত না তাঁদেরও এখন মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে। মঙ্গলবার কলকাতায় সিপিআইএম রাজ্য দফতরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা বলেন সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।

এদিন তিনি আরও বলেন, ওরা সবাইকে আলাদা দিকে পাঠিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। আর অন্যদিকে কিছু কিছু অংশে উন্নয়নের নাম করে লুটের টাকার পাহাড় জমা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে লড়াই। সে লড়াই একটা মৃদু হাওয়া থেকে তেজি হাওয়া, একটা ঝড়ে রূপান্তরিত হচ্ছে। তাতেই ভয় পেয়ে কেউ দিল্লি, কেউ নাগপুর, কেউ কালীঘাট থেকে নানান কথা বলছে। কেউ বলছে নতুন তৃণমূল তৈরি করতে হবে। কেউ বলছে এই সরকার পুজোর আগে যাবে, ডিসেম্বরে যাবে। নতুন সরকার আসবে। কেউ মনে করছেন রাজ্যটাকে ভাগ করে দিয়ে ছোটো ছোটো কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দিলেই হয়ে যাবে। সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষের ঐক্য সংহতি সম্প্রীতি গড়ে তুলে আমাদের নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লড়াই। এ লড়াইতে আপনারাও সামিল হন।

রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে এদিন সিপিআইএম নেতা বলেন, যার যা কাজ সে তাই করছে। আমরা মানুষ জড়ো করছি। কেউ বোমা বন্দুক গুলি জড়ো করছে। কিন্তু মানুষই ইতিহাস গড়ে। নতুন উদ্যমে মানুষ আবার জড়ো হচ্ছে। বন্দুক বোমা ছোরা তলোয়ার ইতিহাস গড়েনি। যদি নয়া ইতিহাস গড়তে হয়, মানুষকে সংঘবদ্ধ হতে হবে। ওরা মানুষকে ছত্রভঙ্গ করেছিল। কে কী করছে তার অপর দাঁড়িয়ে আমাদের কর্মসূচি ঠিক হয়না। আমরা আমাদের মত করে কর্মসূচি তৈরি করি। এভাবেই অতীতে মোকাবিলা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে মিডিয়ার ভূমিকা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এদিন মহম্মদ সেলিম বলেন, মিডিয়া মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ইস্যু নিয়ে আসছে। একে অপরকে গালিগালাজ করছে। তা নিয়ে হয়তো খবরও হচ্ছে। এগুলো বিভেদপন্থীদের কাজ। কিন্তু আমরা বলছি, ভুয়ো বিষয় আসবে। আমরা কোনো ফেক নিউজ, ফেক ইস্যুতে থাকবো না। আমরা জীবন জীবিকার লড়াইতে থাকবো। ওরা রাজ্য ভাগ করতে চাইছে। আমরা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছি। আগামীতে সেটাই ঠিক হবে যে ভবিষ্যতে মানুষ কোন দিকে যাবে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সেলিম বলেন, যখন সরকার লকডাউন করেছিল তখন বামপন্থীরা রাস্তায় ছিল। মানুষ সাহায্য করেছেন। যারা স্বয়ংসেবক নাম দিয়ে বলে সব করে দেব তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। দাঙ্গার সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায় তাঁদের মানুষ বাঁচানোর সময় খুঁজে পাওয়া যায়নি। রেড ভলান্টিয়ারদের কাজে মানুষের মধ্যে ভরসা বিশ্বাস জন্মেছে। অনেক রাজনৈতিক বিরোধী ভরসা করেছেন। আজকে আন্দোলন সংগ্রামের জন্যও মানুষ সহযোগিতা করছেন। মানুষ বাধা পেলে পথ খুঁজে নেয়।

তিনি আরও বলেন, কিছু লোক চুরি করে। আর কিছু লোক চাঁদা তুলে ত্রিপল কিনে মানুষকে দান করে। গত একবছরে উত্তরবঙ্গে যতগুলো ঝড় হয়েছে সরকার কোনো রিলিফ দেয়নি। এই অবস্থাতে দাঁড়িয়েও আমরা চাঁদা তুলে সেই কাজ করেছি।

রাজ্যের ভয়াবহ নিয়োগ দুর্নীতি প্রসঙ্গে এদিন সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক বলেন, রাজ্যে প্রায় সব ধরণের নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। একথাই আমরা বলে আসছি ২০১২ থেকে। আদালতও এই কথাই বলেছে। আমরা বলেছি তদন্ত কর। কার নির্দেশে এই ঘটনা ঘটেছে, কে অপরাধী, লাভবান হয়েছে সেটা খুঁজে বার কর। অন্যদিকে আমাদের রাজ্যের যিনি কূলচূড়ামণি তিনি বারবার মামলা করে এসব আটকানোর চেষ্টা করছেন। ম্যানেজ করে তদন্ত আটকানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি রাতের অন্ধকারে প্রধান বিচারপতির বাড়িতেও গেছিলেন। রাজ্যপালের ভাইয়ের জন্মদিনেও গেছিলেন। দিল্লিতেও ছুটে গিয়েছেন। নাগপুরেও গিয়েছেন। আশার কথা আদালত বলেছে শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়বে।

বামপন্থীদের লড়াইয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ করে বললেন তিনি আসার পরে নাম্বার বাড়াতে বলেছেন। কোন সময় বললেন? যখন তদন্ত চলছে। পুরোটাই মিথ্যাচার। দুর্নীতির এত বড়ো হাঁ, যে সবকিছু গিলে খেয়ে নিয়েছে। গোটা রাজ্যটাকে গ্রাস করতে চাইছেন। এই সর্বগ্রাসী ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই তো লড়াই।

রাজ্যের আদিবাসী মানুষদের অবস্থা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এদিন তিনি বলেন, আদিবাসী মানুষ খাদ্য পাচ্ছে না। জল পাচ্ছে না। ওই এলাকার জন্য, বিশেষ প্যাকেজের জন্য বামফ্রন্ট সরকার লড়াই করেছিল। তারপর প্রকল্প এসেছিল। এই মানুষগুলোকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। উন্নয়নের নামে তিনি নীল সাদা রং করেছেন। কিন্তু মানুষের ন্যূনতম প্রয়োজনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছেনা। কিন্তু মমতা হোক বা মোদী সকলেই মিথ্যাচার করছেন। পিএইচইতে সবথেকে বড়ো দুর্নীতি হয়েছে। মানুষের কাছে পানীয় জল পৌঁছায়নি। টাকা খরচ হয়ে গেছে। পানীয় জল, রাস্তা, আবাসন কিছুই পাওয়া যায়নি।

কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, মমতা অপদার্থ। মোদী তার থেকেও বড়ো অপদার্থ। এখানেই তো ফ্রেন্ডলি ম্যাচ। সিএজি-র যে রিপোর্ট আছে তা কোনো মিডিয়া খবর করে না। আরটিআই-তে নোটিশ করা হলে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেমন দুর্নীতির শিরোমণি উনি তেমনি পাচারকান্ডেও উনি শীর্ষে বসে আছেন। কিষেণজীকে কে এখানে নিয়ে এসেছিল? আগে মুঙ্গের থেকে অস্ত্র নিয়ে আসা হত। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর এত চাহিদা বেড়ে গেল যে ওখান থেকে কারিগর নিয়ে এসে এখানে অস্ত্র কারখানা বসাতে হল। আসলে বেআইনি অস্ত্র ছাড়া ভোট লুট করা সম্ভব নয়।

মঙ্গলকোটে তৃণমূল নেতার হুমকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মঙ্গলকোটকে এঁরা অমঙ্গলকোট বানিয়ে দিয়েছে। যারা মানুষের জীবনকে বিভীষিকা করে দিয়েছে তাঁদের এরকম অনেক কথা বলতে হয়। যারা নিজেদের মাকে ঘর থেকে বার করে দেয় তাদেরই মা মাটির নামে পোস্টার লিখতে হয়। যারা প্রতিদিন প্রেম করে তাঁদের ভ্যালেন্টাইনস দে লাগেনা। যারা প্রতিদিন মানুষের দাবিতে মিটিং মিছিল করে তাঁদের মিটিং মিছিল করার জন্য উপলক্ষ্য লাগে না।

এদিন তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন নির্জলা মিথ্যা কথা প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী বলে যাচ্ছেন। যারা ১০০ দিনের কাজ করেছে তাঁরা মজুরির টাকা পাচ্ছে না। পঞ্চায়েত পুরসভা কোনো কাজ করছে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ডেঙ্গিতে মানুষ মারা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন ওরা টাকা দিচ্ছে না। আর কেন্দ্রীয় সরকার বলছে আমরা টাকা দিয়েছি ওরা চুরি করেছে। এত মিথ্যা না বলে দুই সরকার শ্বেতপত্র প্রকাশ করুক। তারপর আমরা বুঝব কত টাকা চুরি হয়েছে। আমরা যেমন বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে লড়ছি তেমনই রাজ্যের হকের দাবির জন্য লড়ব। তারজন্য মুখ্যমন্ত্রীকে মোদীর বাড়ি গিয়ে বাসন মাজতে হবে না।

এদিন সিপিআইএম রাজ্য কমিটির সংগ্রাম তহবিলে অর্থদানের আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা কোনো মাল্টিন্যাশনাল সংস্থা ভাড়া করতে পারি না। আমাদের যা সাধ আছে সেই সাধ্য নেই। আমাদের কাছে কাটমানি, চিটফান্ডের টাকা নেই। একদিকে জরিমানা, ঘরছাড়া, মিথ্যা মামলা। আমাদের সংগ্রহ ক্রমাগত কমছে। এরমধ্যেই কমরেড বিমান বসু থেকে পার্টি নেতৃত্ব লাল শালু নিয়ে রাস্তায় নেমেছে।

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করেছি আমরা সব মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছি না। কাজের প্রয়োজনে বহু মানুষ রাজ্যের বাইরে। তাঁরাও রাজ্যের ভালো চান। আমরা ডিজিটাল মাধ্যমে রসদ সংগ্রহের অভিযানে নামছি। এখানে কিউবার কোড আছে। আমরা বিশাল টাকা চাইছি না। যার যেমন সামর্থ্য তিনি সেরকম দিন। সেটা পাঁচ টাকাও হতে পারে। আপনাদের সকলের পরিচয় গোপন থাকবে। মানুষের লড়াইয়ে মানুষের রসদ। সিপিআইএম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সংগ্রামী তহবিলে মুক্ত হস্তে দান করুন।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in