১৮ জানুয়ারি বেঙ্গালুরুতে শুরু হচ্ছে CITU-র ১৭তম সর্বভারতীয় সম্মেলন

পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত ট্রেড ইউনিয়ন নেতা শ্যামল চক্রবর্তীর নামে সম্মেলনস্থলের নামকরণ করা হয়েছে 'কমরেড শ্যামল চক্রবর্তী নগর'। চে গেভ্যারার কন্যা অ্যালেইদা ১৯ জানুয়ারি সম্মেলনে আসবেন।
১৮ জানুয়ারি বেঙ্গালুরুতে শুরু হচ্ছে CITU-র ১৭তম সর্বভারতীয় সম্মেলন
ছবি - শঙ্কর মুখার্জি

“ঐক্যবদ্ধ হও, জনমুখী নীতির জন্য লড়াই করো” — এই আহ্বান জানিয়ে বেঙ্গালুরুতে শুরু হতে চলেছে সেন্টার অব ইন্ডিয়ান  ট্রেড ইউনিয়নস - সিআইটিইউ'র সর্বভারতীয় সম্মেলন। এটা সিআইটিইউ'র ১৭ তম সর্বভারতীয় সম্মেলন।

ভারতের সিলিকন ভ্যালি বেঙ্গালুরুতে ১৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে সম্মেলন। শহরের প্যালেস গ্রাউন্ডে এই সম্মেলন চলবে আগামী ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত। ওই দিন হবে প্রকাশ্য সমাবেশ। পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত ট্রেড ইউনিয়ন নেতা শ্যামল চক্রবর্তীর নামে সম্মেলনস্থলের নামকরণ করা হয়েছে 'কমরেড শ্যামল চক্রবর্তী নগর'। সম্মেলনে দেশের প্রায় সব রাজ্য থেকে এবং সমস্ত সংগঠিত ও প্রধান প্রধান অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। প্রতিনিধি সংখ্যা ১৫০০-র বেশি হতে পারে। এই সম্মেলন উপলক্ষে সিআইটিইউ সারাদেশে গত ১০ জানুয়ারি পতাকা দিবস উদযাপন করেছে। প্রসঙ্গত, সিআইটিইউ'র এর আগের সর্বভারতীয় সম্মেলন হয় ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে, চেন্নাইয়ে। দেশে করোনা মহামারী হিসেবে দেখা দেওয়ার ঠিক আগে।

 চে গেভ্যারার কন্যা অ্যালেইদা ১৯ জানুয়ারি সম্মেলনে আসবেন। ওই দিন সম্মেলন মঞ্চে তাঁকে সংবর্ধনা জানাবে সিআইটিইউ। সম্মেলনের সমস্ত সময় উপস্থিত থাকবেন ওয়াল্ড ফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নস-র সাধারণ সম্পাদক পামবিশ কিরিটসিস।

 আগামী  ৫ এপ্রিল সিআইটিইউ, সারা ভারত কৃষক সভা এবং সারা ভারত খেতমজুর ইউনিয়নের ডাকে দিল্লিতে মজদুর-কৃষক সংঘর্ষ সমাবেশ হবে। সেই সমাবেশকে সর্বাত্মক সফল করার ব্যাপারেও সর্বভারতীয় সম্মেলনে আলোচনা হবে।

যৌথ ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে সম্মেলনে। সম্মেলনের উদ্বেধনী অধিবেশনে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির নেতৃত্ব উপস্থিত থাকবেন। গান্ধীজীর আত্মবলিদান দিবস ৩০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি যৌথ কনভেনশন হবে বলে ঠিক হয়েছে। এই কনভেনশনকে সফল করার ব্যাপারেও  সম্মেলনে বিশদে আলোচনা হবে। উদ্বোধনী অধিবেশনে স্বাগত ভাষণ দেবেন সিআইটিইউ'র সাধারণ সম্পাদক তপন সেন। সর্বভারতীয় সম্মেলনে প্রতিনিধি অধিবেশন হব কমরেড রঞ্জনা নিরুলা-কমরেড রঘুনাথ সিং মঞ্চে। প্রসঙ্গত, সিআইটিইউ’র এই দুই নেতা এবং শ্যামল চক্রবর্তী - তিন জনই করোনায় মারা যান।

সিআইটিইউ'র সর্বভারতীয় সম্মেলন বেঙ্গালুরুতে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৫ বছর আগে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে এই প্যালেস গ্রাউন্ডেই সিআইটিইউ’র ১২ তম সর্বভারতীয় সম্মেলন   হয়েছিল।

সিআইটিইউ’র প্রথম সর্বভারতীয়  সম্মেলন হয় ১৯৭০ সালে কলকাতায়। সেই সম্মেলনেই সিআইটিইউ’র স্লোগান দিয়েছিল ‘ ঐক্য এবং সংগ্রাম ’। আজ ৫২ বছর অতিক্রম করার পরও সেই স্লোগানকে ভিত্তি করেই সিআইটিইউ দলমত নির্বিশেষে দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস জারি রেখেছে।

 বর্তমানে দেশের প্রায় সব কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এক মঞ্চে শামিল হয়েছে। শুধু রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শ্রমিক শাখা ভারতীয় মজদুর সংঘ ( বিএমএস) সেই মঞ্চে নেই। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির এই ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ ২০০৯ সাল থেকে কয়েকটি সাধারণ দাবির ভিত্তিতে দেশজুড়ে আন্দোলন পরিচালনা করছে। সংগঠিত করেছে একাধিক সফল সর্বভারতীয় ধর্মঘট। এখন কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির সাধারণ মঞ্চের দাবিসনদে রয়েছে ১০ দফা দাবি।যার মধ্যে অন্যতম হলো মাসিক ন্যূনতম মজুরি ২৬,০০০ টাকা, চার শ্রম কোড বাতিল, নয়া বিদ্যুৎ আইন  রদ, পেট্রোল -ডিজেল সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য হ্রাস, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারিকরণ বন্ধ প্রভৃতি।

 প্রথমে বামপন্থী কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি ঐক্যবদ্ধ হয়ে  আন্দোলন পরিচালনা করত। ২০০৯ সাল থেকে অন্যান্য কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলিও সেই মঞ্চে শামিল হয়। প্রথমদিকে কংগ্রেসের ট্রেড ইউনিয়ন আইএনটিইউসি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি আহুত   শ্রমিকদের জাতীয় কনভেনশনে উপস্থিত থাকলেও মাঝেমাঝেই সর্বভারতীয় আন্দোলন এবং  ধর্মঘট থেকে বিরত থাকত। তবে ২০১৪ সাল থেকে তারা ধারাবাহিকভাবে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির সর্বভারতীয়  মঞ্চের ডাকা   আন্দোলনে ও ধর্মঘটে থাকছে। কিন্তু বিএমএস এই আন্দোলন-ধর্মঘটগুলিতে অংশগ্রহণ করছে তো নাই, সরাসরি বিরোধিতায় অবতীর্ণ  হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির এই মঞ্চে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী, ব্যাঙ্ক, বিমা, প্রতিরক্ষা, টেলিকম, রেলের শ্রমিক-করমচারীদের ফেডারেশনগুলিও যুক্ত হয়েছে। দেশের শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে সিআইটিইউ। বলা যায়, দলমত নির্বিশেষে  শ্রমিক-কর্মচারী  আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করতে নেতৃত্ব প্রদান করেছে তারা। শিল্পভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও এই ঐক্য প্রসারিত হয়েছে। দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে এই অভিমুখে পরিচালনার   দায়িত্ব পালনের সাথে সঙ্গতি রেখেই এবারের সম্মেলনের মূল আহ্বান নির্ধারিত হয়েছে “ ঐক্যবদ্ধ হও, জনমুখী নীতির জন্য লড়াই করো”।

এমনিতেই সিআইটিইউ’র সর্বভারতীয় সম্মেলনে অন্যান্য কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্ব উপস্থিত থাকেন। এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে না। আইএনটিইউসি,এআইটিইউসি, এইচএমএস, এসইডবলিউএ, ইউটিইউসি, এআইসিসিটিইউ সহ প্রায় সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক- কর্মচারীদের ফেডারেশনগুলির নেতৃত্বের  সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

সর্বভারতীয় সম্মেলনকে কেন্দ্র করে কর্ণাটক রাজ্যজুড়ে নিবিড় প্রচার কর্মসূচি চালিয়েছে সিআইটিইউ। রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক জাঠা শুরু হয়েছে। সম্মেলনের বার্তা নিয়ে এই জাঠাগুলি প্রায় সারা রাজ্যই পরিক্রমা করেছে। জাঠাগুলি ‘শহিদ মশাল’ও বহন করে আনছে। এই জাঠাগুলি ১৮ জানুয়ারি ‘শহিদ মশাল’ তুলে দেবে রেড ভলান্টিয়ারদের হাতে। তাঁরা মার্চপাস্ট করে শহিদ মশাল নিয়ে আসবে সম্মেলনস্থলে এবং তুলে দেবে নেতৃত্বের  হাতে। সর্বভারতীয় সম্মেলনকে সামনে রেখে সারা শহরই সিআইটিইউ’র কাস্তে হাতুড়ি খচিত  রক্তপতাকায় সেজে উঠেছে। শহরজুড়ে তৈরি হয়েছে তোরণ; লগানো হয়েছে  অসংখ্য পোস্টার , ফেস্টুন। সম্মেলনের কয়েকদিন শহরের আকাশের রঙ হয়ে উঠবে লাল।

বলা যায় তথ্য-প্রযুক্তির রাজধানী বেঙ্গালুরুতে আজ শ্রমিক পতাকা উড্ডীন।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in