

ভারতের মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা NEET-UG ২০২৬-এর প্রশ্ন ফাঁস কাণ্ডে সোমবার ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA)-র বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিল দেশের শীর্ষ আদালত। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, ২০২৪ সালের বিতর্ক ও নির্দেশের পরেও এনটিএ কোনও শিক্ষা নেয়নি। এই ঘটনায় কেন্দ্র, এনটিএ এবং সিবিআই-কে নোটিস জারি করেছে দেশের শীর্ষ আদালত।
বার এন্ড বেঞ্চ-এর প্রতিবেদন অনুসারে, সোমবার শীর্ষ আদালতে বিচারপতি পি এস নরসিমহা (Justice P S Narasimha) এবং বিচারপতি অলোক আরাধের (Justice Alok Aradhe) বেঞ্চ মামলার শুনানিতে মন্তব্য করে, “এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে এনটিএ এখনও শিক্ষা নেয়নি (It is sad that they have not learnt their lesson)। এই বিষয়টি আগেও সুপ্রিম কোর্টে এসেছিল। তখন একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং তাদের সুপারিশও গ্রহণ করা হয়েছিল।”
আদালত এনটিএ-কে নির্দেশ দিয়েছে, ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট যে সংস্কারমূলক নির্দেশ দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়ে বৃহস্পতিবারের মধ্যে হলফনামা জমা দিতে হবে।
ফেডারেশন অফ অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (FAIMA) সুপ্রিম কোর্টের কাছে করা এক আবেদনে এনটিএ-র পরিবর্তে একটি “শক্তিশালী ও স্বশাসিত” পরীক্ষা পরিচালন সংস্থা গঠনের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনের অভিযোগ, বারবার প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ২২.৭ লক্ষেরও বেশি পরীক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের উপর সরাসরি আঘাত।
FAIMA-র আরও দাবি, নতুন কোনও সংস্থা গঠন না হওয়া পর্যন্ত পুনঃপরীক্ষা পরিচালনা করতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং কমিটি তৈরি করা হোক। যে কমিটির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের রাখা হোক।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রশ্ন ফাঁস আসলে ২০২৪ সালের ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। সেবারও NEET পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তখন আদালত পরীক্ষা বাতিল করেনি এবং বলেছিল, ফাঁসের ঘটনা সীমিত এলাকায় ঘটেছিল।
তবে সেই সময় আদালত এনটিএ-র পরীক্ষা পদ্ধতিতে বড় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছিল। প্রাক্তন ইসরো প্রধান কে রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বে এক বিশেষ কমিটি গঠন করে পরীক্ষা ব্যবস্থাকে “ফুলপ্রুফ” করার সুপারিশও করা হয়েছিল।
এবার আদালত সেই কমিটির কাছেও জানতে চেয়েছে, তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে জানানো হয়েছে, প্রশ্নপত্রের “ডিজিটাল লকিং” বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ধাপে ধাপে NEET-কে সম্পূর্ণ কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা (CBT) হিসেবে চালু করতে হবে।
তাদের যুক্তি, বর্তমানে প্রশ্নপত্র নিয়ে আসা এবং তার রক্ষণ প্রক্রিয়াতেই বড় ধরণের নিরাপত্তাগত ঝুঁকি রয়েছে। CBT ব্যবস্থা চালু হলে প্রশ্নফাঁসের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।
ইউনাইটেড ডক্টরস ফ্রন্ট নামে এক সংগঠন এদিন আদালতে জানিয়েছে, এনটিএ বর্তমানে একটি নিবন্ধিত সোসাইটি হিসেবে কাজ করে এবং সরাসরি সংসদের কাছে জবাবদিহির দায় নেই। ফলে সিএজি অডিট বা সংসদীয় কমিটির বাধ্যতামূলক তদন্তের আওতার বাইরেই এই সংস্থা থেকে যায়।
তাদের দাবি, UPSC বা Staff Selection Commission-এর মতো সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় এনে নতুন আইনের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরীক্ষা সংস্থা তৈরি করতে হবে।
গত ৩ মে এনটিএ NEET-UG ২০২৬ পরীক্ষা পরিচালনা করেছিল। পরে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠায় ১২ মে সেই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। বর্তমানে সিবিআই গোটা ঘটনার তদন্ত করছে।
আগামী ২১ জুন এই পরীক্ষা পুনরায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
এদিকে দিল্লির একটি আদালত সোমবার পুনের পদার্থবিদ্যার শিক্ষিকা মনীষা সঞ্জয় হাভালদারকে ছয় দিনের সিবিআই হেফাজতে পাঠিয়েছে।
সিবিআইয়ের দাবি, NEET-UG পরীক্ষার অনুবাদক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি পদার্থবিদ্যার প্রশ্নপত্র অন্য অভিযুক্তদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের মতে, তিনিই ছিলেন প্রশ্নফাঁসের অন্যতম মূল সূত্র।
মনীষা হাভালদার পুনের Seth Hiralal Saraf Prashala-র শিক্ষিকা। তাঁকে ২২ মে গ্রেফতার করা হয় এবং পরে ট্রানজিট রিমান্ডে দিল্লিতে আনা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত শুনানির নির্দেশ দিয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এনটিএ এবং রাধাকৃষ্ণন কমিটির হলফনামা জমা পড়ার পর ফের এই মামলার শুনানি হবে।
এই মামলার উপর এখন নজর রয়েছে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের। কারণ, প্রশ্ন ফাঁসের পুনরাবৃত্তি শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা নয়, দেশের মেডিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন