Ishwar Chandra Vidyasagar: বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর

বিধবা হয়ে বাপেরবাড়ি এসে কমলা মাকে বলেছিলো, ‘মা, বেধবাদের তো আর বেধবা হবার ভয় নেই। এবার তাইলে ভায়েদের সঙ্গে...’ । অন্দরমহল, বারমহলে ছিছিক্কার।
Ishwar Chandra Vidyasagar: বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরফাইল ছবি সংগৃহীত

এক

দুর্বোধ্য অক্ষরগুলো টানতো। কমলার গলার কাছটায় কষ্ট জমতো। তখনই তর্ক করে ফেলতো মেয়েটা। লোকে বলতো ঝগড়াকুটে। ওইজন্যেই এমন কপাল। কপাল তো ঘরে ঘরে বাপু। বেধবা মেয়ে বউ কোন সংসারে নেই ! সবাই তো আর কমলার মতো মুখরা নয়। বামুনের ঘরের বালবিধবা। সে তো কমলার ছোটপিসিও হয়েছিলো। তবে তার একটা হিল্লেও হয়ে গিয়েছিলো। সহমরণ। তার নাম সতীনক্ষী। কমলার নাম ঝগড়াকুটে।

কমলার স্বামী চোদ্দ বছরের যুবকের রাজরোগ হয়েছিলো। শয্যা নিলো। তার পথ্যি তৈরি করতে গিয়ে সাত বছরের কমলার হাত পুড়ে গিয়েছিলো। জ্বলুনি থামাতে পুকুরের জলে হাত ডুবিয়ে বসেছিলো মেয়েটা। হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে মনে পড়েছিলো ছোটপিসির কথা। জ্বালিয়ে দেবে। তাকেও পুড়িয়ে দেবে। মেয়েটা খুব ভয় পেয়ে জলে ঝাঁপ দিয়ে ভেবেছিলো, আগে মরে যাওয়া ভালো। পুড়ে মরার চেয়ে ডুবে মরার যন্তন্না কম। মেজো জা দেখে ফেলেছিলো। জল থেকে তুলে মরতে দেয়নি।

বছর খানেক পরে কমলার স্বামী চোখ বুজেছিলো কিন্তু ততদিনে প্রশাসন খুব কড়া। শ্মশানে শ্মশানে নজরদারি। ১৮৩০। সেবারও বেঁচে গিয়েছিলো কমলা। শুধু ঠাঁইনাড়া হলো। বাপেরবাড়ি। দুর্বোধ্য অক্ষরগুলো টানতো তাকে। মা ভয় পেতো। লেখাপড়া করলে মেয়েরা বেধবা হয়। বিধবা হয়ে বাপেরবাড়ি এসে কমলা মাকে বলেছিলো, ‘মা, বেধবাদের তো আর বেধবা হবার ভয় নেই। এবার তাইলে ভায়েদের সঙ্গে...’ । অন্দরমহল, বারমহলে ছিছিক্কার। কমলার গলার কাছটা বুজে গেলো। ঠাকুমা একদিন বলেছিলো শুধু, ‘একদিন ঠিক হবে। মেয়েছেলেরা পড়বে কমলি ।’

দুই

বেঁচে থাক বিদ্যাসাগর চিরজীবী হয়ে।

তিন

‘মোচরমানের মেয়েদের ইস্কুলে যেতি নেই কেন দাদি?’ ‘ধম্মে মানা আচে রে বুন’। ‘হেঁদুর মেয়েদের মানা নেই?’ ‘ছ্যালো। আমাদের কালে ছ্যালো। বিদ্যেসাগর নেয়ম দেচে যেতে। একন যাচ্চে সব বইবগলে’। ‘বিদ্যেসাগর আমাদের কবে যেতি বলবে দাদি? মোচরমানের মেয়েদের?’ ‘বলতেচে না তো। মোড়ল এমমরা আবার মানলি হয়’। ‘দাদি, যেদিন বিদ্যেসাগর ইস্কুল যেতি বলবে, এক নয়া দিস। ইস্কুলের সামনে আচার বসে। টিপিনে বাজায় টিং টিং করি। ত্যাখন কিনি খাবো’।

চার

১৮৫৬। ‘বামাবোধিনী’তে তাহেরণ নেছা’র গদ্য ছাপা হলো।

পাঁচ

অপার রহস্য লুকিয়ে আছে ওয়ার্মউড, ক্যামেলথর্ন গাছগাছালিতে। শুকনো মাটি। ফসল নেই। হেলমান্দ থেকে বাঁ দিকে বেঁকে গেছে আরঘান্দাব। নদী আর গাছ হামিদার বড় প্রিয়। বোটানি পড়বার স্বপ্ন নিয়ে কলেজে পৌঁছে গিয়েছিলো। মাঝপথে থামতে হয়েছে যদিও। তবু। তার বর প্রেমিক স্বভাবের। ফয়জানি এক নারীতেই তৃপ্ত। সেকথা ভেবে হামিদার বড় সুখ হয়। তাদের মেয়েটি কবিতা লেখে চমৎকার। রাইহানার স্বপ্ন, সে পাইলট হবে। ফয়জানি আর হামিদাকে সেই কথা বলে তাদের কন্যা। রাইহানার বড়ো বড়ো চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে আবিষ্ট হয়ে যায় হামিদা। মনে হয়, একটা ক্যামেলথর্ন গাছ শুকনো মাটির সঙ্গে লড়াই করে নিজের পাওনা বুঝে নিচ্ছে। কানের পাশ দিয়ে একটা উড়োজাহাজ বোঁ ও করে শরিয়তী আইন হাঁকতে হাঁকতে উড়ে গেলে মা মেয়ে একসঙ্গে চমকে ওঠে খুব জোরে। ফয়জানি বাঁ হাতটা কন্যার মাথায় রাখতে যান কিন্তু পারেননা। নার্ভের অসুখ। হামিদা চোখ বন্ধ করে টের পান, আরঘান্দাব বিপদের আশঙ্কায় তিরতির করে কাঁপছে। ২০২১। আফগানিস্তান তালিবানদের দখলে। সুখ যে উপচে পড়ছিলো এমন নয়। তবু। সালিমা মাজারি নামের গভর্নর মেয়েটিকেও ধরে নিয়ে গেলো। চোখ বাঁধা গান্ধারী। শত সন্তানের জন্ম দিতে হলেও সে ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করেনি ? আইন। আইন। বৈদিক, শরিয়তি!

ছয়

ওদিকে অন্ধকারে কেঁদে মরলে, এক চিলতে আলো কমলাকে দেন বিদ্যাসাগর। কমলা খুব সাবধানে বাঁচিয়ে সে আলো ইস্কুল যেতে চাওয়া মেয়েটিকে একদিন দিলে, তাহেরণ সে আলো হাতে পায়। তারপরে হামিদা সে আলো রাইহানাকে দিচ্ছিলো। কতবার যে প্রবল ঝড়ে নিভে যায় ! হামিদা ভয় পেলে কমলা তাকে অভয় দেয়। জ্বলবে। জ্বলবে। কোনো তালিবানের সাধ্য কী! অনির্বাণ যে!

সাত

হামিদা দেখে, রাইহানা সেই আলোর মশাল খুঁজে পেয়ে এরোপ্লেন চালাচ্ছে। আকাশে আলো, আলো।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.