মৃত্যু অথবা ঘুম

খাটের উপরে খোলা বাংলা বই। শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা তুমি’’ কবিতাটি কাগজে সেঁটে আছে কুষ্ঠরোগের ক্ষতের মতো। শিরিষ কাগজের মতো চোখে বাঁধছে শব্দগুলি। বিষম উৎকট একটি বিরক্তি প্রকাশ পেল হ্যালুসিনেশন ভেবে।
মৃত্যু অথবা ঘুম
গ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

অধ্যাপক আহমাদ জামিলের এখন প্রধান কর্তব্য হচ্ছে নিজের শরীরকে মাটিতে দাঁড় করিয়ে রাখা। হার্টে রিং। ছেলের মৃত্যুর খবরটি যেন হার্ট পর্যন্ত না পৌঁছে, নিজেকে যতদূর পর্যন্ত সম্ভব নির্দয় হবার চেষ্টা করা। এই মুহূর্তের করণীয় ঠিক করে নেওয়া যাক ভেবে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিলেন, খবরটি যেন মিসেস আফরোজা জামিলের কানে না পৌঁছে সেই ব্যবস্থা করা। মর্গে গেলেন না। কলেজ থেকে রিকশা নিয়ে সোজা ফিরলেন বাসায়।

রান্নাঘরে চিংড়ি মাছ দিয়ে পুঁইশাক ঝোল করে রান্না চলছে। অধ্যাপক জামিল ঘরে ঢুকতেই সাদা মেলামাইনের চামচে টলমলে ঝোলে ফুঁ দিতে দিতে মিসেস জামিল এগিয়ে এসে বললেন- নাও, একটু চেখে দেখো তো লবণের কী দশা। তোমার তো ভাতে লবণ চলে না।

অধ্যাপক জামিল মুখ হা করতেই বুকের খাঁচায় যেন একঝাঁক কইমাছ একসঙ্গে কাঁটা বিঁধিয়ে নৃত্য করে উঠল। বোবা জন্তুর মতো গোঙিয়ে বুক চেপে ধরে উফ্ করে উঠে বলেন, সামান্য পেইন। কিন্তু এই বলে পার পেলেন না। চাবুক মারার শব্দের মতো বুকের ভেতর থেকে হিস্ হিস্ শব্দ উজানে ঠেলে আসছে। বেসামাল করে দিচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাস। অধ্যাপক জামিলের নিয়ন্ত্রণহীন নিশ্বাসের ভিতর দিয়ে দাঁতাল অন্ধকার ঢুকে ফুসফুসকে কামড়ে ধরেছে।

ও আল্লা রে! কাকে ডাকি রে! এতো স্ট্রোকের লক্ষণ! দৌড়ে ছেলেকে ডাকবে বলে মোবাইল হাতে নিতেই কলিজা কাঁপিয়ে বেজে ওঠে। বাটুন টিপে কানে ধরতেই একটি গম্ভীর কণ্ঠ ও প্রান্ত থেকে বলে, এইটি কি আপনার ছেলের মোবাইল?

মিসেস জামিল ত্রস্তকণ্ঠে বললেন, হে হে ভাই, ছেলেকে দিন। ছেলের বাবা স্ট্রোক করছে।

আপনার ছেলে মারা পড়েছে। এখন হাসপাতালের মর্গে আছে। আপনারা কেউ একজন থানায় আসুন। না হলে...।

শেকড় কেটে দিলে গাছ যেমন আলগোছে পড়ে যায়, কোন সাড়াশব্দ না করে মিসেস জামিল ফ্লোরে লুটিয়ে পড়লেন তেমনি।

অধ্যাপক জামিল অন্ধকারের ধকল কাটিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে বললেন, তোমার ছেলে এখন মর্গে। মরা-থেতলানো ইঁদুরের মতো মুখগুঁজে পড়ে আছে। তুমি হাত-পা ছেড়ে মরা চিতল মাছের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লে! আমার শরীরেও তো মরণের মতো ক্লান্তি। নয় মাসের যুদ্ধের ক্লান্তি তো গেল-ই না! আমি কি এখন তোমার পাশে ঘুমুবো? বুকের ভেতরে নিশ্বাস আটকে গেল মনে হয়।

অধ্যাপক জামিল কোন কর্তব্য পালন করবেন? মিসেস জামিল যেভাবে ফ্লোর হামলে চিৎ হয়ে পড়ে আছেন। এদিকে নিজের শরীরকে দাঁড় করিয়ে রাখা গেলেও মন ভেঙে পড়ছে পাহাড় ভাঙার মতো। হাড়-পাঁজর ভেঙে গুড়িয়ে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে আসছে মেরুদণ্ড। বুকের ভিতরের বাড়ন্ত ব্যথা দ্রুত শরীরকে জমিয়ে সাপের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে ফেলছে। অস্তিত্বের সবটুক শক্তি প্রয়োগ করেও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তের কর্তব্য কর্মও তাকেই পালন করতে হবে।

মিসেস জামিলের নিশ্বাসের বাতাসে, না দক্ষিণের জানালা দিয়ে আসা বাতাসে, কোন দিকের বাতাসের চাপ সইতে না পেরে দেয়ালের শরীর থেকে খড়াৎ করে ফ্লোরে পড়ে গেল মুক্তিযুদ্ধের বাঁধাই করা সনদ! হায় হায়! শব্দের একটি চিৎকারের আওয়াজ বেপরোয়া কৃমির মতো জোর করে কণ্ঠ পর্যন্ত উঠে আসলেও অধ্যাপক জামিল ওখানেই থামিয়ে দিলেন ভয়ানক এক ঢেকুর তুলে।- যা শালা! খেল্ খতম!

এবার মিসেস জামিল ডান কাঁৎ থেকে বাম কাঁৎ হয়ে একবার চোখের পাতা মেলে ধরলেন। চোখের শিরা-উপশিরার রেখাগুলো ভয়ানক নিস্তব্ধ। নীরব। কোনো বিস্ময় নেই। কোনো জিজ্ঞাসাও নেই। যার একমাত্র সন্তান মর্গের লাশ কাটা ঘরে, তার আবার কী জিজ্ঞাসা থাকতে পারে!

ভাঙা কাঁচ-কাঠ-সনদের টুকরোগুলোকে আবর্জনার মতো সরিয়ে খাটের কিনারায় আসতে গিয়ে ক্রুশ আকৃতির এক টুকরো কাঁচ মাছের পেটে বড়শি গাঁথার মতো ক্যাচ করে ঢুকে গেল অধ্যাপক জামিলের পায়ের তালুতে। মিসেস জামিলের পাশে বসে কাঁচ টেনে তুলতে তুলতে বলছেন- বিজয়ের মা, তোমার আক্কেল-জ্ঞান কবে হবে? তুমিও কী ছেলের মতো লাশ হয়ে গেলে! বাড়িটাকেই মর্গ বানিয়ে ফেললে? আমি হাসপাতালের মর্গে তোমার ছেলের কাছে যাবো, না তোমার কাছে থাকবো?

অধ্যাপক জামিলের বুকের ভেতরে শ্বাসকষ্ট রোগীর মতো শাঁ শাঁ শব্দের উথালিপাথালি, সেই শব্দকে সামাল দিতে হচ্ছে জোরে জোরে শ্বাস ফেলে। খাটে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। পায়ের জোড়, হাঁটুর জোড়, কোমরের জোড়ের সংযোগস্থলের নাট-বল্টু কারা যেন খসিয়ে নিয়ে শরীরকে প্রাণহীন রোবটের মতো আলগোছে দাঁড় করিয়ে রেখছে! নড়লেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে। একহাতে বুকের বামপাশের ব্যথাস্থল সেঁটে ধরে, অপর হাতে দেয়ালের উপর ভর দিয়ে শক্তসামর্থ্যরে মতো কয়েক ধাপ হেঁটে ঢুকলেন ছেলের ঘরে। দাঁড়ালেন শাসনের ভঙ্গি নিয়ে। এবার তার দুই হাত টানা সোজা, পিতৃত্বের পৌরুষ চোখে-মুখে। ছেলে ঘরে নেই-তাতে কী? পিতা হিসেবে তার দায়িত্ব বাড়ন্ত ছেলের এসব দেখা। ছেলে ফিরলে কী ধরনের শাসনবাক্য ছুঁড়ে কাবু করা যায় ভেতরে ভেতরে একটা রিহার্সেল সেরে নিলেন।

খাটের উপরে খোলা বাংলা বই। শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা তুমি’’ কবিতাটি কাগজে সেঁটে আছে কুষ্ঠরোগের ক্ষতের মতো। শিরিষ কাগজের মতো চোখে বাঁধছে শব্দগুলি। বিষম উৎকট একটি বিরক্তি প্রকাশ পেল হ্যালুসিনেশন ভেবে। খোলা বইটির শরীর ঘেঁষে ২টা টিউশন খাতা, মেডিক্যাল ভর্তি গাইড, জড়ানো-প্যাঁচানো টিশার্ট, এক ঠ্যাঙের ভেতরে আর এক ঠ্যাঙ ঢুকে পরা জিন্সের প্যান্ট, একপাশে ঝুলে আছে বিছানার চাদর, কম্পিউটার কোনমতে বন্ধ করতে পারলেও পেনড্রাইভ এখনো সিপিইউতে আটকানো। কী বলা যায়! মানিব্যাগটাও ফেলে গেছে বাইরে! -মাথার উপরে খটখট শব্দ। ফ্যান চলছে। ছেলেটা ছেলেমানুষই থেকে গেল!

অধ্যাপক জামিলের বুক কাঁপিয়ে কলিংবেল বেজে ওঠে। অভ্যাসগতভাবেই প্রতি উত্তর দিলেন, এই কে? কাকে চাই?

দরজার ওপার থেকে ছেলেকণ্ঠের চাপাশব্দ-আংকেল! দরজা খুলুন। আমি, আমি আরিফ।

বিজয় বাসায় নেই। অধ্যাপক জামিল অভ্যস্ত কণ্ঠে বললেন।

আংকেল, আমি বিজয়ের খবর নিয়ে এসেছি। ছেলেটার শরীর কাঁপছে।

কী আশ্চর্য ! গলাকাটা মুরগি যেমন মরার আগে শেষ দাবড় দিয়ে একবার উঠে দৌড়াতে চায়, ‘বিজয়’ শব্দটি কানে ঢুকতেই তেমনি এক দাবড়ানো দিয়ে ছুটে আসলেন মিসেস জামিল। দরজার সামনে এসেই সুতোছেঁড়া ঘুড়ির মতো দুমড়ে-মুচড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে লুটিয়ে পড়লেন। ডুবন্ত মানুষের মতো শূন্যে হাতড়ান। একটা কিছুকে হাতের মুঠোতে ধরার জন্যে বাতাসে হাত-পা ছুঁড়েন। গোঙানোর মতো আওয়াজ করে বলেন, ওগো বিজয়! বি-জয়!! বি-জ-য়!!!

ছেলেটার এবার বিশ্রী চিৎকার করছে। অসহ্য ঠেকলেও কিছুতেই অধ্যাপক জামিল ছেলের সান্নিধ্যের ঘোর থেকে বেরুতে চান না। কিন্তু নিকটে মিসেস জামিল মাথা ফেলে দিয়ে র্গর র্গর শব্দ করে এমনি মরণ ঢেকুর তুলছে যে, স্বামী হিসেবে নেহায়াতই কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলে দু’পা এগিয়ে যেতে হল। এরিমধ্যে বুকের ব্যথা চড়াৎ করে জেগে উঠে ফের। একহাতে বুক চেপে ধরে, আরেক হাতে দরজার সিটকিনি খুলতে গিয়ে শরীর ঝাঁকি মারায় সিটকিনির কামড়ে বুড়োআঙুলের চামড়া থ্যাতলে রক্ত জমে লাল হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল, আসামের ট্রেনিং ক্যাম্পে স্টেনগান চালাতে গিয়ে অসতর্কতাবশত একবার তর্জনীর মাংস থ্যাতলে অকেজো হয়ে ছটফট করার স্মৃতি। ক্যাপ্টেন ইলিয়াসের সে কি ধমক- ঐ দেখো, লুঙি নেংটি দেওয়া নূর আলিকে দেখো, এক সপ্তাহেই ফিট। আর তুমি কলেজের ছাত্র, দুই সপ্তাহেও হাত কাঁপে!

ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল ছেলেটা। বলল, আঙ্কেল তাড়াতাড়ি পালান! আন্টিকে মা বলছে আমাদের বাসায় নিয়ে যেতে।

হোয়াট!-অধ্যাপক জামিল আঘাতখাওয়া জন্তুর মতো বীভৎস কণ্ঠে চিৎকার করতে গিয়ে শ্বাসকষ্টের কারণে ব্যর্থ হলেন।

টিভি খুলেননি? টিভির খবরে দেখাচ্ছে ? ছেলের চোখে-মুখে বিস্ময়।

কী দেখাচ্ছে ? অধ্যাপক জামিলের ধমকের কণ্ঠ।

বিজয় ডাকাতি করতে গিয়েছিল! ওর কাছে পিস্তল ছিল! ওর নামে তিনটা মামলা!

ডাকাতি! মামলা!! পিস্তল!!! অধ্যাপক জামিল ফিক করে হেসে দিলেন। যার ছেলে ডাকাত! পকেটে পিস্তল নিয়ে ঘোরে, তিন মামলার আসামি! তার বাবাকে ধরা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বৈকি। তোমার আন্টি যেতে পারবে না।

অতি তুচ্ছ একটা ঘটনা। এমন ঘটনা রেগুলার ঘটে। পত্র-পত্রিকা, টিভির হট নিউজ এসব খুন, গুম, ডাকাতি। এমন একটি অভিব্যক্তি দেখাতে চেষ্টা করে ভয়ানক পরিহাস হিসেবে ধরা পড়ে ছেলের বন্ধু ছেলেটির কাছে।

আংকেল! আপনি ভেঙে পড়লে আন্টির কী হবে?

তুমি তো আমার বিজয়ের সাথে ছিলে, কীভাবে ঘটল?

আমরা দুজনে শালবাগানে শরিফ স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম। স্যারের সাথে দেখা করে ফেরার পথে উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির সামনে হঠাৎ ককটেল ফোটার শব্দ শুনে বিজয় দাঁড়িয়ে গেল। আমি বললাম, চল, এখানে থাকা নিরাপদ না। দেখিস না, চারিদিকে কী চলছে। লোকজন ডাকাত ডাকাত করে ছুটোছুটি করছে। ও শুনল না। বলল, দাঁড়া, ঘটনা কী দেখি। হঠাৎ কয়েকজন এই ধর ধর বলে আমাদের দিকে ছুটে আসল। আমি দৌড় দিলাম। বিজয় নড়ল না। আমি কিছুদূর গিয়ে দেখি, লোকজন বিজয়কে ঘিরে ধরেছে। বিজয় চিৎকার করছে-আমি কলেজের ছাত্র, আমি কিছু করিনি। কলেজের আইডি কার্ড দেখাল পর্যন্ত। কিন্তু ওরা শুনল না। দশ-বারোজন পুলিশ গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। বিজয় ছুটে গিয়ে আই ডি কার্ড দেখাল। তারপর আমি কিছু দেখি নি। ওরা আমাকেও ধাওয়া করল।

ছেলেটা কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলল। ফের তাগাদা দিল অনুরোধের কণ্ঠে- তাড়াতাড়ি পালান, আংকেল। আর দেরি করবেন না!

অধ্যাপক জামিলের চোখে রক্ত জমে চাক্ চাক্ হয়ে আছে। চোখের দিকে একবার তাকিয়ে এখানে থাকা নিরাপদ হবে না ভেবে ছেলেটা যেভাবে ছুটে এসেছিল ঠিক সেভাবেই ছুটে বেরিয়ে গেল।

মিসেস জামিলের নিস্তব্ধ চোখের দিকে মুখ করে অধ্যাপক জামিল কিছু বলার ভাব নিয়ে কী মনে করে ঠোঁটে বিদ্রƒপের হাসি টেনে আনলেন। ঠোঁটের ভাঁজে বিদ্রƒপ, করোটির ভাঁজে বিদ্রƒপ, আধা-পাকা চুলের ভাঁজে বিদ্রƒপ, বিদ্রƒপ অধ্যাপক জামিলের সর্বাঙ্গে। মরা গরুর ঠ্যাং ধরে টানার মতো মিসেস জামিলের দুই হাত ধরে টেনে ড্রইংরুমে নেবার চেষ্টা চালাচ্ছেন। অনুভূতিহীন পাথর শরীর টানতে গিয়ে বুকের উপর বাড়তি চাপ পড়ায় নিশ্বাসের উপদ্রুব বেড়ে গেল। শ্বাস ফেলার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলছেন, তোমার ছেলের নাম টিভির খবরে দেখাচ্ছে। তুমি মা হয়ে দেখবে না! পরে আমারে দোষাবেÑঅ্যা! চিরকাল আমাকেই দুষলে! ছেলে মর্গে গেল! সেও কি আমারি দোষ! এভাবে মরণ বিছানা নিলে!

মোবাইলের শব্দপীড়নে আর টিকতে পারা গেল না। অধ্যাপক জামিল বিরক্তিতে হিস করে উঠেন। কল রিসিভ করেই কর্কশ কণ্ঠে ধমক মারলেন- এই কে? কে শুনি ?

অধ্যাপক জামিল, আমি অধ্যক্ষ বলছি।

ওহ স্যার! সরি স্যার, কিছু মনে নেবেন না। আমাদের ছেলেকে টিভির খবরে দেখাচ্ছে তো! অন্যমনস্ক ছিলাম। আমার ছেলেকে তো দেখেছেন স্যার। হালকা লকলকে, সবে গোঁফ গজাচ্ছে। এবারই এইচএসসিতে জিপিএ ফাইভ পেল। গোল্ডেন ফাইভ। ওকে আপনি বলেছিলেন স্যার-বাবার মতো শিক্ষক না হয়ে ডাক্তার হবে। মুক্তিযোদ্ধার ছেলে। বাবা অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করেছে, তুমি অস্ত্র ধরে মানুষ কাটবে। ওর মা তো ছেলেকে ডাক্তার না বানিয়ে কবরে যাবে না বলে খুদ আল্লার সাথে সন্ধি করে আছে। দেখেন স্যার- মেয়েমানুষটা কেমন পাগল! বলে হা হা হা শব্দে ভাঙা কণ্ঠে দমফাটা হাসি দিতে গিয়ে দম আটকে আসে। অধ্যাপক জামিলের অসমাপ্ত হাসির অপ্রতিরোধ্য তরঙ্গ অধ্যক্ষের কান দিয়ে করোটিতে পৌঁছে বলকানো দুধের মতো মগজে বলক তুলে। অধ্যক্ষের শরীরসহ মুষ্ঠিবদ্ধ রিসিভারের তারে কাঁপন ওঠে।

অধ্যাপক জামিল! পালান! এই মুহূর্তেই! এক কাপড়ে! থানার এক কনস্টেবল আমাদের কলেজের ছাত্র। আমাকে গোপনে ফোন করে জানাল, যে কোন সময় ওরা আসতে পারে। আপনি যেন ওরা আসার আগেই বাড়ি ছাড়েন।

অধ্যাপক জামিল কট করে লাইন কাটলেন। সেট লক্ করে ছুঁড়ে মারলেন। এখনই বাইরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। মিসেস জামিলের বে-আবরু পেট-পিঠে কাপড় টেনে দিতে দিতে চোখ গেল নাভির নিচের, যেখানে সন্তান জন্মের কালচে দাগ। সারাজীবনে একটি মাত্র সন্তান জন্ম দিয়ে-ই এত বড়ো জন্মদাগ! রত্নগর্ভা পেট হলেও না মানাত!

পুরনো মরচে ধরা সিটকিনি আহত হাতে খুলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেন অধ্যাপক জামিল। দরজায় তালা মেরে দিলেন বাইরে থেকে। সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে পা ফস্কে দুবার করে পড়ে যেতে গিয়েও শরীরের টাল সামলে পৌঁছে গেলেন গেট পর্যন্ত। গেটের তালা খোলা, লাগানো এবং চাবি প্যান্টের বাম পকেটে রাখা, এই তিনটি কঠিন কাজ ঠিকঠাক করতে পারায় আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। এবার ডোন্টকেয়ার ভাব নিয়ে হাঁটছেন। সুড়ঙ্গমত গলিপথ ছেড়ে অধ্যাপক জামিল যখন বহুকৌণিক মোড়ে দাঁড়ালেন, ঠিক তখনি একসঙ্গে আগুনের মতো জ্বলে ওঠে মিউনিসিপ্যালিটির বৈদ্যুতিক বাতিগুলো। প্রাণভরে দম নেবার জন্য প্রকাশমুদির দোকানের সামনে নিরাপদ একটি জায়গা দেখে দাঁড়ালেন।

মিউনিসিপ্যালিটির ডাস্টবিন ফেলার লালরঙের ট্রাকের উপরে ৩ জন উঠতি কিশোর কী মনে করে চড়ে বসেছে, ওরা যে নিজেরাও জানে না, এমন ভাব করে এলোমেলো হাঁটছে। তিনজনের হাতে তিনটি ভিডিও মোবাইল। থেমে থেমে মাথা ঠুকাঠুকি করে নিকটে ভিড়ে। মোবাইলের স্ক্রিনে কিছু একটা দেখে সমস্বরে হি হি করে ওঠে। ফাঁকে ফাঁকে জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশার যুবতীকে দেখে। ঠোঁট-জিহবা এক করে স্ক্রিনে মনোযোগ ফেরায়। মন চাইলে মোবাইল তাক্ করে ছবি তুলে। মোড়ের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর লম্বা এক রঙিন ব্যানার টাঙানো চলছে। উন্নয়নের ৪ বছর পূর্তিতে নগরবাসির পক্ষ থেকে নগরপিতাকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্টার। রিক্সা, অটোরিক্সার ম্যারাথন লাইন পেছনে।

অধ্যাপক জামিল কোথায় যাবেন ঠিক করে বের হননি। সামনে তিনটি অপশন- থানা, মর্গে, না হয় বাসায় ফেরা। একবার ভাবলেন, বাসায় ফিরবেন। আলো জ্বালাতে হবে। বাইরে থইথই করছে আলো। ঘরে একটা লাইটও জ্বলবে না! অবশ্য কে জ্বালাবে? কার জন্যে জ্বালাবে? ছেলের ঘরটা বই-খাতা-কম্পিউটারের জঙ্গল। মেয়েমানুষটা আর একবার নিশ্বাস ফেলল কিনা! নাকি বুকের গহিনে সোনার গহনার মতো নিশ্বাসকে আটকে রেখে অপেক্ষায় আছে হবু ডাক্তার ছেলে ফিরলে ফেলবে। চিরকাল অবুঝ-ই থেকে গেল। দুর্ভিক্ষপীড়িতের মতো একসাথে অনেক নিশ্বাস নিতে গিয়ে দম আটকে গেল। সারস পাখির মতো গলা লম্বা করে নিশ্বাস ফেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে মরণ আসন্ন ভেবে বসে পড়লেন রাস্তায়।

প্রকাশমুদি দোকান থেকে ছুটে এসে ধরল- স্যারের কি শরীর খারাপ? অনেকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছি, এখানে দাঁড়িয়ে ছট্ফট্ করছেন!

অধ্যাপক জামিল ভেতর থেকে বাতাস বেরিয়ে আসে নাকডাকা রোগীর মতো র্গর শব্দ করে। নিশ্বাসের দ্রুত-উঠানামা চলছে। কথা বলার অবসর দিচ্ছে না। নিশ্বাসের ভাঁজে ভাঁজে ফেলে ‘টিভির’, ‘খবর’ ‘দেখলেন’ তিনটি শব্দকে তিনবারে উচ্চারণ করে প্রকাশমুদিকে কথা বলার সময় না দিয়ে তাড়া খাওয়া বন্যপ্রাণির মতো সামনে ছুটলেন।

দপ্ করে বাতিগুলো নিভে লোডশেডিং, অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে। অধ্যাপক জামিলের ভেতরে ডগমগ করে ওঠে। এখন ভেতর-বাইরে সমান অন্ধকার। নিশ্বাসও চলনসই। বাসায় ফেরা হচ্ছে না। সামনে দুটো অপশন-থানা অথবা মর্গে?

দুপুর থেকে ছেলেটা মর্গে। কর্তব্যজ্ঞান এতটা লোপ পেল কবে! শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে কিছু পথ হেঁটে মর্গে যাবেন বলে সাব্যস্ত করতেই হুট করে লাইট জ্বলে ওঠে। কী আশ্চর্য! প্রকাশমুদির দোকান থেকে মাত্র কয়েক ধাপ সামনে খোলা ম্যানহোলের কিনারে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অধ্যাপক জামিল। এক-ইঞ্চি পা সরলে অজগরের মতো হা করে থাকা ম্যানহোলের ভেতরে স্বাচ্ছন্দ্যে ঢুকে পড়বে পূর্ণ শরীর।

শরীরকে নিরাপদ করার কথা ভাবছেনও না। এখন একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়ার চেষ্টা। কিন্তু সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বত্রিশ দাঁত বের করে কেলাচ্ছে প্রতিবেশি হাবিবুল্লাহ বাহার। লোকটা মিউনিসিপ্যালিটির ইঞ্জিনিয়ার।

-কি ভাই, ছেলে কি ডাক্তার হলো? আমার বউ তো আপনার উপরে ভীষণ ক্ষ্যাপা, বলে, ভাই আর পাঁচ বছর আগে বিয়ে করলে ছেলেটার বয়স আরো ৪ বছর বাড়তো, তখন আমার ডাক্তারি পড়া মেয়েটার সাথে বিয়ে দিয়ে ভাবিকে বিয়াইন বানাতে পারতাম। ভাই-বোন বড়ো করতে গিয়ে এদিকে পিছালেন। ভাবির মতো এমন ভাল মানুষ নাকি সে জীবনে আর একটিও দেখেনি। ছেলেটাকে পাখির ছানার মতো নিজের মনের মতো তৈরি করছেন। দেখবেন, আপনার ছেলে ডাক্তার হলেও কসাই ডাক্তার হবে না।

লোকটার গায়ে পড়ে প্রশংসা করার স্বভাব। বউয়ের রেফারেন্স ছাড়া কথা বলে না। অধ্যাপক জামিলের ভাল লাগে না। রাস্তায় দেখা হলে হাই-হ্যালো করে পাশ কাটিয়ে চলেন। এখন এই বিরক্তিটুকু মেনে নিতে হচ্ছে। খালি রিকশা পাওয়া যাচ্ছে না। গায়ে ধাক্কাধাক্কি করে লোকজন আসা-যাওয়া করছে। এরমধ্যে জায়গা দখল করে আলাপ জমানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। অধ্যাপক জামিলের নিরুত্তাপ চাহনি, শরীরের ক্লান্তি, আলাপে অনীহা, অবজ্ঞা, বুকের ভেতরের দেয়াল ফেটে বেরিয়ে আসা অসমাপ্ত নিশ্বাস কোনো কিছুই কি লোকটার চোখে পড়ছে না। মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা হিসেবে মিসেস জামিলের সাথে তার স্ত্রীর বন্ধুত্বের সম্পর্কটাকে আলাপের প্রসঙ্গ হিসেবে টানে। দু’পাটির বত্রিশ দাঁত বের করে কেলাতে কেলাতে বলে- আমার ওয়াইফের মুখে ভাবির বাচ্চা হওয়ার কাহিনি শুনে তো হাসতে হাসতে হয়রান হয়ে মাথা চক্কর দিচ্ছিল। রীতিমত ড্রামা রে ভাই! মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হবে বিজয়ের দিনে, নাম রাখবেন বিজয়, এজন্য ভাবির সিঁথানে নাকি আজরাইল চলে এসেছিল? ১৫ই ডিসেম্বরের দুপুর ১২টায় প্রেগন্যান্সির ব্যথা জাগে, সেই ব্যথা রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত বালিশ কামড়ে কী করে সামাল দিল! আপনার ভাবি অর্থাৎ আমার ওয়াইফ বলে, আর পাঁচ মিনিট দেরি হলে নাকি নির্ঘাত মৃত্যু! এবার লোকটার আফসোসের কণ্ঠ- আপনার ভরা সুখের সংসার ভাই!

ধৈর্য আটকে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব হল অধ্যাপক জামিলের। কিন্তু ম্যানহোলের কিনারটি নিরাপদ। ধাক্কা লাগার ভয় নেই। ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে চিৎকার করতে, কিন্তু চিৎকার করে কিছু একটা বলতে হবে। কী বলবেন-ডাকাতি করতে গিয়ে ছেলেটা এখন মর্গে। ছেলের মা নিজের ঘরটাকেই মর্গ বানিয়ে ফেলেছে। নিজে দাঁড়িয়ে আছি ম্যানহোলের কিনারায়।

হঠাৎ একটি খালি রিকশা টুংটাং বেল বাজিয়ে অধ্যাপক জামিলের সামনে দাঁড়াল। আসি ভাই, ছেলেটা মর্গে আছে-বলে লাফিয়ে রিকশায় উঠে বসলেন। রিকশার হুক তুলে দিলেন।

বিস্ময়ের ঘোর নিয়ে রিকশা চালাতে আসুবিধা হওয়ায় চালকের মুখ ঠেলে বেরিয়ে আসল- আপনার পোলারে কারা খুন করছে? অধ্যাপক জামিলের নির্মম নীরবতা চালক মেনে নিতে চায় না। কিন্তু যার ছেলে এই মুহূর্তে মর্গে, তার মানসিক বাস্তবতাটাকেও সে ভাবে। ল্যাম্পপোস্টের লাইটের নিচে ঘাড় ঘুরিয়ে অধ্যাপক জামিলের চেহারার আভিজাত্য দেখে নিশ্চিত হয় চালক-চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বা বোমা ফুটানোর মতো কোন কাজ করে মরেনি এই লোকের ছেলে। মরতে পারে কলেজ-ভার্সিটিতে গুলা-গুলি করে, না হয় গুলাগুলির মধ্যে পড়ে। হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়ে ভাড়া হাতে নিতে নিতে চালক নিজের আইডিয়াকে নিশ্চিত করতেই জিজ্ঞেস করল- আপনের পোলায় কি কলেজে পড়ে? অধ্যাপক জামিল হু করে পিঠ ফিরিয়ে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকে গেলেন।

পেছন থেকে অনেকক্ষণ ধরেই ‘স্যার স্যার’ শব্দটি ধাওয়া করছে অধ্যাপক জামিলকে। শব্দের নাগালের বাইরে যেতে জোরে হাঁটছেন। শরীরের সমস্ত শক্তিতেও কুলোচ্ছে না। হাসপাতালের আলো-বাতাসে ওষুধ আর লাশের গন্ধ। এদিকে মর্গের যত কাছে আসছেন, নিশ্বাসের ওঠা-নামা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। হার্টে বাতাস চলাচলের গতি দ্রুত পড়ছে। অধ্যাপক জামিল আর পারলেন না। নাছোড় শব্দটিকে টেক্কা দিয়ে পালিয়ে যাবার শক্তি তার শরীরে নেই। পরাজয় মেনে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

স্যার আপনাকে কতক্ষণ ধরে পেছন থেকে ডেকে যাচ্ছি!- এক যুবক ডাক্তার সমানে হাঁপাচ্ছে। আমাকে চিনতে পারছেন স্যার? বিরানব্বই-তিরানব্বই ব্যাচের ইন্টারমেডিয়েটের ছাত্র ছিলাম।

অধ্যাপক জামিল নির্বোধের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেন।

স্যার, কী ভাবছেন? আমরা যে ৫ জন বিকেলের ব্যাচে পড়তাম, পাঁচজনের তিনজনেই ডাক্তার স্যার। একজন ইঞ্জিনিয়ার। আর একজন, রিফাতকে মনে পড়ে স্যার, ও কিন্তু বিরাট শাইন করেছে স্যার। ইউকেতে থাকে।

যুবক ডাক্তারের মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে অধ্যাপক জামিল ভাবছেন- যাকে ভাষা দিয়েছেন, বিশ্বাস দিয়েছেন, মহৎ ও বড়ো হওয়ার স্বপ্ন দিয়েছেন, তাকে কি বলা ঠিক হবে যে, নিজের ছেলে এখানে মর্গে। ডাকাতি করতে গিয়ে গণপিটুনিতে খুন হয়েছে। কিন্তু ডাক্তারের অভিব্যক্তি ও আতিশয্য দেখে অধ্যাপক নিশ্চিত হয়েছেন, ডাক্তার তার প্রিয় শিক্ষকের কোন উপকার না করে ছাড়বে না।

ভেতরে আবেগের বাড়াবাড়ি চলছে টের পেয়ে যুবক ডাক্তার কথার লাগাম টেনে ধরে-স্যার, ম্যাডাম কেমন আছেন? আপনার ছেলে বিজয় কোথায় পড়ছে?

বিজয় এখানেই আছে। মর্গে। বলে যুবক ডাক্তারকে বাইপাস করে সোজা দৌড়ালেন অধ্যাপক জামিল। সামনে থেকে আসা লাশবাহী ট্রলির সাথে মৃদু ধাক্কা খেয়ে হেলতে গিয়ে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলেন না। ভেতর থেকে রিং ছেঁড়ার পট্ পট্ শব্দ পেলেন। সুনামির মতো অন্ধকার ছুটে আসে চারিদিক থেকে। মৃত্যুর ছায়া পড়ে কেঁপে উঠছে ধাবমান অন্ধকার।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in