কানান্না সো উম্মাতাম ওয়াহেদাতান

কানান্না সো উম্মাতাম ওয়াহেদাতান
ছবি প্রতীকীগ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

তখনো উপন্যাসটা পড়া হয়নি। এইচ।এম।ভি-র দৌলতে ক্যাসেটে বাজতো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তী, পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষের গলা।

শুনে শুনে ভেতরটা অমিত-লাবণ্যময় হয়ে গেল। তখন ফ্রকবেলা। তারপর শিলং পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে কী ব্যাকুল হয়ে খুঁজেছি কোন পাহাড়ের পায়ে চলা পথের শেষ ঠিকানা ঠিকানা অমিতর বাসা। পাগলের মত দেখতে চেয়েছি যোগমায়ার গৃহখানি। পাইন গাছের নিবিড়ে সেসব কাঠবিড়ালীরা কোথায় লুকিয়ে থাকছে, যারা লাবণ্যের উদাসীন হাতের ছুঁড়ে দেওয়া আখরোট খেত! শিলং পাহাড়ে কি তাঁরা কেউ কোথাও নেই! বড় হয়ে বুঝেছি আছে। ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি।’ সেইই সত্য। শিলং পাহাড় সত্য। অমিত, লাবণ্য, কেটি সত্য। আমার সেই খোঁজার আবেগটুকু সত্য। না পাওয়াটাও সত্য। আর সবচেয়ে বড় সত্য কবির কল্পনা।

পদ্মাবতীর চিত্রায়ণে তোলপাড় গোটা দেশ। তা বেশ তো। সাহিত্য নিয়ে ভাবছে মানুষ এ বড় আশার কথা। কিন্তু এই হিংস্রতার মানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে কি? আওধী ভাষায় ‘পদুমাবৎ’ কাব্য লিখলেন মুহম্মদ জায়সী। তার বেশ কিছুটা সময় পরে আরাকান রাজসভার কবি সৈয়দ আলাওলের অনুবাদে ‘পদুমাবৎ’ হলো ‘পদ্মাবতী’। সময়টা ১৬৫১ খ্রিষ্টাব্দ। এই অনুবাদের উদ্দেশ্য নিজেই লিখেছেন কবি। আর যাই হোক ইতিহাসচর্চা নয়। বরং আরাকান রাজসভায় বাঙালি কবি ও শ্রোতাদের মানবতার চর্চাই এ লেখার মূল উদ্দেশ্য। আলাওল নিজেই লিখছেন –

‘প্রেম বিনে ভাব নাহি ভাব বিনে রস।
ত্রিভুবনে যত দেখ প্রেম হস্তে বশ।।
প্রেমমূল ত্রিভুবন যত চরাচর।
প্রেমতুল্য বস্তু নাই পৃথিবী ভিতর।।’

প্রেমতুল্য আর কোনও বস্তু নেই এ বিশ্বে। দীপিকা পাড়ুকোন তাহলে প্রেমের জয়গান গাইতে দাঁড়ালেন ক্যামেরার সামনে। এবং ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে পদ্মাবতীকে দেখতে চাইলেন সঞ্জয় লীলা বনসালী। পদ্মাবতীতো বড্ড সুন্দর কবি আলাওলের চোখে।

“স্বর্গ হইতে আসিতে যাইতে মনোরথ।
সৃজিল অলকারণ্যে স্বর্গ সিঁথি – পথ।।

কিবা করবীর মাঝে স্বর্ণ রেখাকার।
যমুনার মাঝে যেন সুরেশ্বরী ধার।।

কবি জায়সীর কল্পনাতেও এমনই সুন্দর ছিল পদ্মাবতীর বাইরের ও অন্তরের রূপখানি “পুহুপ সুগন্ধ পরহি সব আসা।/মুক হিরিকাই লেই হাম বাসা।।’’ কী জীবন্ত অস্তিত্ব মেয়েটির। কী গভীর প্রেম! আলাউদ্দিন খলজি তো পৃথিবীর সেইসব ‘উঁচুতলাকার লোক। তাদের দাবী এসে সব নেয়। নিয়ে নিতে চায়। ‘নারীকেও নিয়ে যায়।’ ভুল। রবীন্দ্রনাথই বলেছিলেন আসল কথাটি। ‘রমণীর মন/সহস্র বর্ষের সখা সাধনার ধন।’ বেচারা আলাউদ্দিন। ক্ষমতা দিয়ে দখল করতে চেয়েছিলেন ‘রমণীর মন।’ পদ্মাবতী যে ভীমসেনে সমর্পিত। অতএব মৃত্যু। জহরব্রত। পরাজিত খলজি সাহেব। এইতো ছিল সত্য। যে সত্যে পাঠক-শ্রোতার চোখ প্লাবিত হয়েছে। কবি পেয়েছেন অমরত্বের বর।

এ সবই সত্যি। সত্যি, সত্যি, সত্যি। তিন সত্যি। কিন্তু সাহিত্যের সত্য। ইতিহাসের পাতায় সাহিত্যের সত্যর কোনো আবেদন নেই। সাহিত্যের সত্যের আবেদন মানব হৃদয়ে।

ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব স্পষ্টতই বলেছেন – “Though Alauddin Khilji had won Chittor dring that period there is no mention of any character as Padmavati in history.”

আলাউদ্দিন খিলজির চিতোর আক্রমণের প্রায় আড়াইশো বছর পরে মহম্মদ জায়সী ‘পদুমাবৎ’ লিখছেন। তারও পরে আলাওল গ্রন্থটি অনুবাদ করছেন এবং ১৬৫১ থেকে ২০১৭ – এই বিরাট সময়ের ব্যবধানে সঞ্জয় লীলা বনশালী পদ্মাবতীকে নিয়ে একটি সিনেমা তৈরি করছেন।

সিনেমাটা আমি দেখিনি এখনও। কিন্তু কোথায় আঘাত লাগলো? কেমন করে আঘাত লাগলো যে পরিচালক, অভিনেত্রীর নাক এবং পরে মাথার দাম ঘোষণা করতে হল!

‘রাজছত্র’ তো ভেঙ্গে পড়েছে কবে – কতকাল। ‘রণডঙ্কাও’ আর ‘শব্দ নাহি তোলো।’ তবু এরা কারা? যারা ইতিহাসের সত্য বোঝেনা, সাহিত্যের সত্য বোঝেনা, শুধু ইতিহাসের পাতায় বর্তমানের তাজা গরম রক্ত ছেটাতে চায় উন্মত্তের মত! চিনিনা। এঁদের কাউকে চিনিনা। এরা কেউ আমার স্বজন পড়শী নয়।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in