দেশের বিরোধী রাজনীতি এবং...

ক্রমশ একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আপাতদৃষ্টিতে যে ঘটনা গুরুত্বহীন মনে হলেও আদপেও গুরুত্বহীন নয়। যা সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে কতটা সুখকর সে প্রশ্ন তোলাই যায়।
দেশের বিরোধী রাজনীতি এবং...

মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাদ দিয়েও গত দু’দিনে উল্লেখযোগ্য দুটো ঘটনা ঘটে গেছে। ক্রমশ একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আপাতদৃষ্টিতে যে ঘটনা গুরুত্বহীন মনে হলেও যা আদপেও গুরুত্বহীন নয়। যা সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে কতটা সুখকর সে প্রশ্ন তোলাই যায়।

মহারাষ্ট্রে মহা বিকাশ আঘাদি সরকারের পতনের পর গতকাল উদ্ধব ঠাকরে জানিয়েছেন, যদি অমিত শাহ নির্বাচনের আগে হওয়া কথা রাখতেন তাহলে আজ মহারাষ্ট্রে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হত।

মহারাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বিজেপির পুরোনো এবং প্রথম জোটসঙ্গী শিবসেনা প্রধানের এই বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে তিনি সুকৌশলে বিজেপির এবং শিবসেনার পুরোনো জোটের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। যে জোটধর্ম মেনেই ২০১৯-এর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন লড়া এবং জয়লাভ। যদিও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মুখ্যমন্ত্রীত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে বিজেপির রাজী না হওয়া এবং যার ফলে জোট ভেঙে অন্য দুই বিরোধীপক্ষ এনসিপি এবং কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে মহাবিকাশ আঘাদি গঠন ও ক্ষমতা দখল।

রাজ্যে কংগ্রেস এবং এনসিপির-র সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গড়লেও শিবসেনার অতীতের সঙ্গে এই দুই রাজনৈতিক দলের অতীত মেলে না। বরং তা অনেক বেশি বিজেপি ঘেঁষা অথবা বলা যেতে পারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিজেপির থেকেও চড়াসুরে কথা বলতে অভ্যস্ত ছিল শিবসেনা। হিন্দুত্বের প্রশ্নে সেক্ষেত্রে শিবসেনাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বললেও খুব একটা ভুল কিছু বলা হবেনা। যদিও সরকারে বসার পর চরম হিন্দুত্বের লাইন থেকে অনেকটাই সরে আসে শিবসেনা। অন্য দুই সহায়িকা শক্তির সুরে সুর মিলিয়ে নিজেদের অনেকটাই নরম করে নেয় শিবসেনা।

যদিও সরকার পতনের পর উদ্ধব জানিয়েছেন, এনডিএ-তে থাকার সময় আমি আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে জানিয়েছিলাম আড়াই বছরের জন্য শিবসেনাকে মুখ্যমন্ত্রীত্ব পদ দিতে হবে। সেই সময় অমিত শাহ তা মেনে নিলে রাজ্যে কোনো মহাবিকাশ আঘাদি গঠিত হত না। উদ্ধব ঠাকরের এই মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীত্ব হারানোর জন্য নাকি এনডিএ থেকে বেরিয়ে আসার যন্ত্রণায় তা ভবিষ্যৎ বলবে। শিবসেনা যে আর কখনও এনডিএ-তে ফিরে যাবেনা এখন কী আর সেরকম বলে দেওয়া সম্ভব?

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিজেপি রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে আগে দ্রৌপদী মুর্মুর নাম বললে তিনি ভেবে দেখতেন। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে তিনি এবং তাঁর দল তৃণমূল এনডিএ প্রার্থীকেই সমর্থন দিত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দ্রৌপদী মুর্মুর চান্স যে বেশি তা জানাতেও তিনি ভোলেননি। অতীতের তৃণমূল বিজেপি জোটের কথা মনে রাখলে সেই সমর্থন খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয় বোধহয়। কারণ এর আগে একাধিকবার তৃণমূল বিজেপির জোট হয়েছে এবং সংসদেও বিভিন্ন ইস্যুতে এনডিএ-র পক্ষে ভোট দিয়েছে তৃণমূল। এবার মুখ্যমন্ত্রী মহিলা প্রার্থীকে সমর্থনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। অথচ অতীতেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একাধিক মহিলা প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং তখন তৃণমূলের মুখে এই ধরণের কোনো কথা শোনা যায়নি।

মহারাষ্ট্র হোক, অথবা পশ্চিমবঙ্গ – দুটো ঘটনা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার। দেশের অর্থমন্ত্রীর মুখ ফসকে হর্স রেসিং বলতে গিয়ে হর্স ট্রেডিং বলে ফেলাটা যেমন মোটেই গুরুত্বহীন নয়, তেমনই নেহাত পরিস্থিতির চাপে এই দুই রাজ্যের শীর্ষ নেতা নেত্রীর অন্য শিবিরে সমঝোতা খুঁজতে বেরোনোও গুরুত্বহীন নয়। সামান্যতম সুযোগেই তাঁরা যে কথা বলে ফেলেছেন তা তাঁদের অন্তরে সযত্নে লালিত ভাবনাচিন্তারই ফসল। সুতরাং দেশের বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ আগামী কয়েক বছর ঠিক কোন পথে চলতে পারে তা এই দুই সামান্য ঘটনাতেই দিনের আলোর মত স্পষ্ট।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in