"আমার বিশ্বাস, বিকল্প কেউ হতে পারলে বামপন্থীরাই হতে পারেন।" মৃত্যুর কয়েকদিন আগে সিপিআইএমের বাংলা মুখপত্র গণশক্তির শারদ-সংখ‍্যায় একথা লিখেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। দীর্ঘ ৪০ দিনের লড়াইয়ের পর রবিবার দুপুর ১২ টা বেজে ১৫ মিনিট নাগাদ না ফেরার দেশে চলে যান আজীবন বামপন্থায় বিশ্বাসী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে স্বজন হারানোর শোক পশ্চিমবঙ্গের বাম দলগুলোর নেতাদের মধ্যে।

ছাত্র জীবনে প্রত‍্যক্ষভাবে বাম রাজনীতি করলেও অভিনয় জীবনে সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেননি তিনি। তবে একাধিকবার বামেদের অরাজনৈতিক মঞ্চে উপস্থিত থেকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি। লকডাউনের মধ্যে বামেদের শ্রমজীবী ক‍্যান্টিনেও এসেছিলেন তিনি।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তথ‍্য সংস্কৃতি বিভাগের অন‍্যতম পরামর্শদাতা ছিলেন তিনি। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় একাধিক শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা যখন 'পরিবর্তন চাই' ব‍্যানারে নিজেদের মুখ দেখাচ্ছিলেন, তখন বামদলের পাশেই ছিলেন তিনি। এমনকি ২০১১ সালে সরকার পরিবর্তনের পরও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেননি তিনি। প্রকাশ‍্যে রজ‍্যের বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলেও ২০১৩ সালে সরকারের দেওয়া বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত‍্যাখান‌ করেছিলেন তিনি। যদিও ২০১৭ সালে রাজ‍্য সরকারকে সম্মান জানাতে সেই পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি।

সিপিআইএমের বাংলা মুখপত্রের শারদ সংখ্যায় "এখনও বিশ্বাস করি, বামপন্থাই বিকল্প" শীর্ষক নিবন্ধে দেশে বর্তমানে যে ধর্মীয় উন্মাদনা শুরু হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন তিনি। তাঁর শৈশবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একে অপরকে কীভাবে শ্রদ্ধা করতেন সেই কথা বলেছেন তিনি। কিন্তু এখন মানুষের মধ্যে উগ্র সাম্প্রদায়িক মনোভাব দেখে উদ্বিগ্ন তিনি।

সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নাম না নিয়ে তিনি লেখেন, "ভাবলে অবাক লাগে, যাঁর আমলে ২০০২ সালে গুজরাটে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হলো, সেই তিনিই আজ ভারতবর্ষের মসনদে। ভারতবর্ষের মানুষ এদের সহ‍্য করছেন। তাঁদেরই ভোট দিয়ে আবার জেতাচ্ছেন।... মহামারীতে এত মানুষ আক্রান্ত, এত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, এককথায় দুঃসহনীয়। তার মধ্যেও রামের নামে রাজনীতি চলছে।"

নিবন্ধে বারেবারে বামপন্থাকে বিকল্প উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। কিন্তু সাথে সাথে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন তিনি। তিনি লেখেন, "আমার বিশ্বাস, বিকল্প কেউ হতে পারলে তা বামপন্থীরাই হতে পারেন। কিন্তু সেই দৃঢ়তা কোথায়? মানুষের মনে ভরসা তৈরি করতে পারছেন কোথায়? এই সময়েই খুব হতাশ হয়ে পড়ি।"

নিবন্ধের একেবারে শেষে তিনি লিখেছেন, "গোঁড়ামি তৈরি করতেই চালাকি করে ধর্ম ও রাজনীতিকে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কে রামকে ভালবাসল, কে রহিমকে - তা কোনও ব‍্যাপারই হতে পারে না। তাই বার বার মনে হয়, এসবের বিকল্প হতে পারে একমাত্র বামপন্থাই।"

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন