গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে কি নেই সে বির্তক শুরু হয়েছে। স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র প্রথম হোঁচট খায় ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে। সারাদেশের মানুষ সেদিন দেখেছিল ধর্মভিত্তিক শোষক রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে বের হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ স্বপ্নে বাংলাদেশেও গণতন্ত্র শাসকশ্রেণির হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে। সে ইতিহাস বাংলাদেশের সোনালী অর্জনের পাশে কলঙ্কের কালির মতো লেগে আছে।

১৯৭৫ এ বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ থেকে গণতন্ত্র নাই করে দেয়া হয় এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের উল্টো পথে যাত্রা শুরু করে। এরপর গণতন্ত্রের জন্য আবারও দীর্ঘ লড়াই করতে হয়। সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে সীমিত আকারে গণতন্ত্র- আসলে নির্বাচনতন্ত্র, চালু করেন। ১৯৮২ সালে আবার সেনাশাসন। ১৯৯১ সালে দেশে আবার সার্বজনীন ভোটে সরকার আসে কিন্তু গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বলে যে স্বপ্নের দেশের কথা জনমনে কল্পিত হয়েছে তা আজও অধরা। গণতান্ত্রিক দেশে গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে গণ্য করা হয়। মানুষের চিন্তার, কথা বলার ও নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বীকৃত। বাংলাদেশ গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীন হয়েছে। সংবিধানেও বাংলাদেশকে গণপ্রজাতন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সে সব কেতাবেই সীমাবদ্ধ। বর্তমানে বাংলাদেশে গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের কথা বলার উপরে সরকারি নিষেদ্ধাজ্ঞা জারি করে নিদের্শনা জারি করা হচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশে বাক-স্বাধীনতায় সরকারের পক্ষ থেকে ক্রমাগত যে বিধি নিষেধ দেয়া হচ্ছে সেটা আরও বাড়ছে এবং কঠোর হচ্ছে।

বাংলাদেশে গণমাধ্যম ও ব্যক্তির বাক-স্বাধীনতা হরণ ও সংকোচন নিয়ে স্বাধীনতার পর থেকেই আলোচনা-সমালোচনা চলে আসছে। বর্তমানে ডিজিটাল মিডিয়ার যুগে মানুষ গণমাধ্যমের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিধি-নিষেধ দেয়া হয়েছে। ‘গুজব’ ঠেকানোর দোহাই দিয়ে এবং গণমাধ্যমের অপব্যবহার রোধ, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষার নামে আইন করে অবাধ তথ্য প্রবাহ বন্ধ করা হচ্ছে। সম্প্রতি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণ কেমন হবে সে বিষয়ে বেশ কিছু সরকারি প্রজ্ঞাপন নাজেল হয়েছে। গত ১৮ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সব মন্ত্রণালয়ের সচিবদের চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মচারীরা গণমাধ্যমে কথা বলতে কিম্বা অনলাইনে বক্তব্য, মতামত বা নিবন্ধ প্রকাশ করতে পারবেন না।[১] নিদের্শনায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার (১৯৭৯) ২২ নম্বর বিধির ব্যত্যয় ঘটিয়ে, সরকারি কর্মচারীরা বিভাগীয় প্রধানের অনুমতি ছাড়া কিম্বা ‘প্রকৃত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র’ ছাড়া বেতার কিংবা টেলিভিশনের সম্প্রচারে অংশগ্রহণ করতে অথবা কোনো সংবাদপত্র বা সাময়িকীতে নিজ নামে অথবা বেনামে অথবা অন্যের নামে কোনো নিবন্ধ বা পত্র লিখতে পারবে না। তবে কিছু শর্ত দিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে ‘এ ধরনের ক্ষেত্রে অনুমোদন দেওয়া হবে যদি ওই সম্প্রচার বা নিবন্ধ বা পত্র সরকারি কর্মচারীর ন্যায়পরায়ণতা, বাংলাদেশের নিরাপত্তা অথবা বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না করে অথবা জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নেতিকতার বিঘ্ণ না ঘটায় অথবা আদালত অবমাননা, অপবাদ বা অপরাধ সংগঠনের প্ররোচনা হিসেবে গণ্য না হয়।’ সরকারি কর্মচারীরা কেবল গণমাধ্যমেই কথা বলতে পারবেন না বিষয় এমন নয়। বরং তারা ফেইসবুকেও তাদের নিজস্ব মতামত তুলে ধরতে পারবেন না বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এবিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, অনেক কর্মকর্তা ফেইসবুকে এমনভাবে লিখছেন, যার ফলে মাঝে মধ্যেই বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, অনেক সময় ওইসব লেখা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধির যে দোহাই দিয়ে ওই চিঠি দেয়া হয়েছে তাতে সারাদেশে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথা অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। যেটা বাংলাদেশের সর্ব্বোচ্চ আইন তথা সংবিধানের ৩৯ এর ১ অনুচ্ছেদের বিরোধী। যেখানে নাগরিকদের বাক-স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তথাপি সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায়পরায়ণতা, বাংলাদেশের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা, নেতিকতার বিঘ্ণ, অথবা আদালত অবমাননা, অপবাদ বা অপরাধ সংগঠনের প্ররোচনা বন্ধের নামে গণমাধ্যমে কিম্বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। এর ফলে সরকার স্বীয় কৃতকর্মের বিষয়ে নাগরিকদের একটা বৃহৎ অংশের সমালোচনা ও প্রতিবাদ থেকে নিজেকে নিরাপদ করে নিয়েছে। আর সেটা করা হয়েছে আইনের দোহাই দিয়ে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে সংবিধানের ৩৯ এর ১ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়ার পর ২ অনুচ্ছেদেও সেটার লাগাম টানা হয়েছে। তথা সংবিধানে নাগরিকদের চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার স্বীকৃতিও শর্ত মুক্ত নয়। পুঁজিবাদী বুর্জোয়া রাষ্ট্রের চরিত্র এমনই।

কেবল সরকারি কর্মচারী নয় সম্প্রতি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীদেরও গণমাধ্যমে কথা বলার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতর গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের নার্সদের কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নোটিশ দিয়েছে।[২] নোটিশে বলা হয়েছে, ‘নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের আওতাধীন সব সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীকে চাকরি বিধি অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জনসম্মুখে, সংবাদপত্রে বা অন্য কোনও গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা, বিবৃতি বা মতামত প্রদান না করতে নির্দেশ দেওয়া হলো।’ নার্স ও মিডওয়াইফারি অধিদফতরের আওতাধীন সব সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীদের কথা বলার নিষেধাজ্ঞা এবং সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাতের বেশ কিছু অনিয়মের ঘটনা মিলিয়ে দেখলে কেন এই নিষেধাজ্ঞা সেটার কারণ স্পষ্ট হয়।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণের ফলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত কতটা খতরনাক এবং অব্যবস্থাপনা ভয়াবহতা কী পরিমাণ সেটা জনসম্মুখে স্পষ্ট হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক অবনতি জনমনে সরকারের প্রতি ক্ষোভ সৃষ্টির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনাকালে সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে সাধারণ রোগীদের সেবা এবং করোনা টেস্ট নিশ্চিতকরণে সরকারের অব্যবস্থাপনা গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ হতে থাকে। চিকিৎসা না পেয়ে, হাসপাতালে অক্সিজেন না পেয়ে মানুষ মারা যাওয়ার করুণ দৃশ্য দেশের মানুষের সামনে প্রকাশ হয়েছে। এছাড়াও করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামেও যে দুর্নীতি হয়েছে তা নিয়ে ক্ষোদ ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জনতার ক্ষোভ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষোভ যেন মিশতে না পারে এটা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য জরুরী হয়ে পরেছিল। তাই কর্মচার্রী বিধিমালা আইনের দোহাই দিয়ে নার্স ও চিকিৎসাকর্মীদের জনসম্মুখে ও গণমাধ্যমে কথা বলার বিষয়টি বন্ধ করা খুব দরকার ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে সেটাই নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেয়া নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বক্তব্য সেটাই প্রমাণ করে। সংবাদমাধ্যমের কাছে নার্সেস সংগঠনের নেতারা বলেন, ‘আমরা করোনা রোগীদের সেবা করছি। অথচ না পারছি খেতে, না পারছি ঘুমাতে। না দিচ্ছে কোনও প্রটেকশন। ঊর্ধ্বতন কেউ খোঁজও নেয় না।’ নাম প্রকাশ না করে এক নার্সেস নেতা বলেন, ‘কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের নার্সরা খাবার পাচ্ছেন না। এমন অমানবিক অবস্থার পরও আমরা কথা বলতে পারবো না? আমরা সেটা জানাতে পারবো না। তারা রোগীদের সেবা করে স্টোরে ঘুমাবে, রোগীর বেডের নিচে ঘুমাবে, এটা নিয়েও কথা বলতে পারবো না। এখন আমরা কোনও মিডিয়াতেও কথা বলতে পারতেছি না। তাহলে আমার মেয়েগুলোর (নার্স) অবস্থা কেমন হবে বোঝেন।’[৩] স্বাস্থ্যকর্মীদের এসব বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদফতর কেন গণমাধ্যমের সামনে নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা বলায় নিষেদ্ধাজ্ঞা দিয়েছে। সরকার চাচ্ছে গোটা স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা যাতে জনসম্মুখে ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত না হয়।

সরকারের এই চালাকি কেবল সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা লুকানোর চেষ্টাতেই সীমাবদ্ধ নয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসার নামে মানুষের জীবন নিয়ে যে বাণিজ্য করা হয় এবং সেখানে চিকিৎসা সেবায় কী পরিমাণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা সেটাও লুকাতে সরকারি প্রজ্ঞাপন নাজেল করা হয়। গত ৪ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পূর্বানুমতি ছাড়া দেশের যে কোন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অভিযান পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দেয়া হয়।[৪] চিঠিতে দাবি করা হয় করোনা পরিস্থিতিতে পূর্বানুমতি ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে স্বাস্থ্য সেবা ব্যহত হচ্ছে। তাই সেবা সুষ্ঠু রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা কী সেটা করোনাকালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের কিছু মহাকেলেঙ্কারির দিকে দৃষ্টি দিলেই দেখা যাবে। এই নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত এমন সময় নেয়া হয় যখন রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথ-কেয়ারে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে ভূয়া করোনা টেস্টের সনদসহ নানা অনিয়মের প্রমাণ পায়। এবং এরই ভিত্তিতে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত শাহেদ করিমকে গ্রেফতার করা হয়। সংবাদমাধ্যমে দেয়া র‌্যাবের তথ্য বলছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪২৬৪টি স্যাম্পল রিজেন্ট হাসপাতালে টেস্ট করেছে এবং এর বাইরে ৬ হাজারের বেশি স্যাম্পল টেস্ট না করেই তারা ভূয়া রিপোর্ট দিয়েছে।[৫] কেবল করোনা টেস্ট জালিয়াতিই নয় ২০১৩ সাল থেকে হাসপাতালটি লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় চলছে। এবং হাসপাতালটি চিকিৎসা সেবা দেয়ার মতো উপযুক্ত নয় বলেও র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়। অন্যদিকে জেকেজি হেলথ-কেয়ারে বিনামূল্যে করোনা টেস্ট করানো কথা থাকলেও রোগীর কাছ থেকে টাকা নেয়া হচ্ছিল এবং টাকা নিয়েও করোনা টেস্টের ভূয়া সনদ দেয়া হচ্ছিল।[৬] এছাড়াও সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের নিম্নমানের মাস্ক, পিপিইসহ অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য সারাদেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আজাদ এবং হাসপাতাল পরিচালকসহ একাধিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ওএসডি হন।

বর্তমানে সারাদেশে কতগুলো হাসপাতাল লাইসেন্স বিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় আছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া দুষ্কর। সংবাদমাধ্যম ডয়েচ ভেলের এক অনুসন্ধান বলছে, বাংলাদেশের অর্ধেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ। শতকরা অন্তত ১০ ভাগ হাসপাতালের কোনো লাইসেন্সই নেই।[৭] গোটা স্বাস্থ্য খাতের এই যখন পরিস্থিতি তখন নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের গণমাধ্যমে কথা বলতে নিষেদ্ধাজ্ঞা, পূর্বানুমতি বাদে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনায় নিষেদ্ধাজ্ঞার মতো বিষয়টি যে অনিয়মত, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আড়াল করার একটি নকশা সেটা সহজেই অনুমেয়। এর ফলে সরকার একদিকে যেমন স্বাস্থ্যখাতের অনিয়মত, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা আড়াল করতে চাচ্ছে তেমনি নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা বলার অধিকারও কেড়ে নিয়েছে।

গত ৭ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকদের পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, মন্তব্য জানানো, লাইক ও শেয়ারের ব্যাপারে বিধি-নিষেধ আরোপ করে নিদের্শনা দিয়েছে।[৮] মাউশি’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারসংক্রান্ত নির্দেশনা’য় বলা হয়েছে, কলেজের শিক্ষক ও ছাত্ররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, মন্তব্য, লাইক ও শেয়ার করতে পারবেন না। বিধি-নিষেধের মধ্যে আরও রয়েছে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সার্ভিস বা পেশাকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পোস্ট দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী কোনো রকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না। এ ছাড়া জন-অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন বিষয় লেখা, অডিও বা ভিডিও প্রকাশ বা শেয়ার করা এবং ভিত্তিহীন, অসত্য বা অশ্লীল তথ্য প্রচার থেকেও বিরত থাকতে হবে। মাউশি’র প্রজ্ঞাপনের ৬ অনুচ্ছেদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজের অ্যাডমিনদের জন্য বলা হয়েছে, সরকারি নীতিমালার পরিপন্থী, নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান, দপ্তর ও সংস্থার বিপক্ষে অবস্থানকারী কোনো পোস্ট অনুমোদন করা যাবে না। অন্যথায় অ্যাডমিন ও পোস্টদাতা উভয়ের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মাউশি’র এই নিদের্শনায় কলেজ শিক্ষক ও ছাত্রদের স্বাধীন মতপ্রকাশের পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মাউশি হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো এবং এর পিছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে? একটু পিছনের ফিরে কয়েকটি ছাত্র-আন্দোলন দেখতে হবে। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছিল। যে আন্দোলন স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীরা শুরু করেছিল এবং সারাদেশে দাবানলের মতো এই আন্দোলন ছড়িয়ে পরে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ২৯ জুলাই থেকে ০৮ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশের সড়ক পথে টাফিকের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপিসহ রাস্তায় সব ধরণের গাড়ির লাইসেন্স ও ডাইভিং লাইসেন্স চেক করে। এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল অনেকটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেই। কোনো বড় সংগঠন বা রাজনৈতিক দল এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়নি। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাই এই আন্দোলন চালিয়েছিল এবং সেটা করেছিল ফেইসবুক ব্যবহার করে। এর আগে ২০১৮ সালের শুরু থেকে সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটাপথা সংস্কারের দাবিতে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তুলে। সরকারের নানা দমন-পীড়ন সত্বেও বৃহৎ আন্দোলনের কারণে সরকার কোটাপ্রথায় সংস্কার আনতে বাধ্য হয়। সেই আন্দোলনও মূলধারার গণমাধ্যমে প্রথম দিকে বেশি প্রকাশ পায়নি। ফেইসবুকই ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সারাদেশে সংগঠিত করার অন্যতম মাধ্যম। বলতে গেলে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে মূলধারার গণমাধ্যম অনেক আন্দোলনের সংবাদ প্রচার না করলেও সেটার বিকল্প হিসেবে ফেইসবুক ব্যবহার হচ্ছে।

সম্প্রতি সারাদেশে অব্যাহত ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে আবার ছাত্র-জনতার আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। এই আন্দোলনও সংগঠিত হয়েছে, ধর্ষণের খবর প্রথম প্রকাশ হয়েছে ফেইসবুকে। মাউশি যে দিন কলেজ শিক্ষক ও ছাত্রদের জন্য ফেইসবুকের ব্যবহার বিধি নিয়ে নির্দেশনা জারি করে সেদিন ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে শাহবাগে ধর্ষণ বিরোধী মহাসমাবেশের ডাক দেয়া হয়। এর আগেও তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মন্ত্রণালয় ঘেরাও, গণভবন ঘেরাও, শাহবাগে গণ-অবস্থান কর্মসূচির পালন করেছে। যার ফলে সারাদেশে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পরে। এরই ভিত্তিতে ৯ অক্টোবর শাহবাগে মহাসমাবেশের ডাক দেয়া হয়। সেটা ছিল সরকারের জন্য বড় হুমকি। তাই সরকার চাচ্ছে গণমাধ্যমের বিকল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুককেও নিয়ন্ত্রণ করতে। মাউশি যে নির্দেশনা দিয়েছে সেটা এরই প্রকাশ। কারণ কোটা সংস্কার আন্দোলন, স্কুল-কলেজ ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং চলমান ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনগুলো ছাত্ররাই করছে এবং তাদের প্রচার ও সংগঠিত হওয়ার মাধ্যম হচ্ছে ফেইসবুক। তাই বর্তমানে ফেইসবুকে আচরণ বিধি নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য অস্তিত্বের লড়াইয়ে সামিল।

তথা-কথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার সব সময় চায় সাধারণ মানুষের চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতা রুখতে। কারণ এইসব রাষ্ট্র ও সরকার তাদের অধিকাংশ কাজেই গণবিরোধী। ফলে তাদের বিরুদ্ধে জনতার ঐক্যের যে কোন পথ নিয়ন্ত্রণ অস্তিত্বের প্রশ্নেই জরুরী। বাংলাদেশ সরকারও সে পথেই হাঁটছে। তবে চূড়ান্তভাবে জনতার জয় কখনই ঠেকানো যায়নি।

তথ্যসূত্র :

১. দৈনিক যুগান্তর (অনলাইন সংস্করণ), ২৪ আগস্ট ২০২০ খ্রি.

২. বাংলা ট্রিবিউন, ১৭ এপ্রিল ২০২০ খ্রি.

৩. প্রাগুক্ত

৪. দৈনিক যুগান্তর, ০৫ আগস্ট ২০২০ খ্রি.

৫. বিবিসি বাংলা, ৭ জুলাই ২০২০ খ্রি.

৬. বিবিসি বাংলা, ১৩ জুলাই ২০২০ খ্রি.

৭. ডয়েচ ভেলে, ০৮ জুলাই ২০২০ খ্রি.

৮. দৈনিক প্রথম আলো (অনলাইন সংস্করণ), ০৯ অক্টোবর ২০২০ খ্রি.

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন