বেশ কিছুদিন ধরে নভেল করোনা ভাইরাস নিয়ে চর্চা করতে করতে কখন যে নিজেই সে ঘায়ে ঘায়েল হয়ে পড়ব বুঝতে পারিনি। যাক। আমার বয়স্ক মায়ের প্রাথমিক রোগলক্ষণ দেখা দেওয়ার পরই আমার শরীরেও তার উপস্থিতি ধরা পড়ল। অল্প জ্বর সাথে কাশি এসব আসায় প্রাথমিক চিকিৎসা চালানোর সাথে সাথেই ২ দিনের মাথায় সরাসরি rt pcr টেস্ট করার সিদ্ধান্ত নিই। তখনও রোগের লক্ষণ ন্যূনতম। কিন্তু ১৮ তারিখের টেস্টে রিপোর্ট ২০ তারিখ পজিটিভ আসে দুজনেরই। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম নার্সিংহোমে ভর্তি হবার।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি রোগটি সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত। কেউ তথ্য দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করছেন এটা শুধুই প্রচার। আপাত নিরীহ এই রোগ নিয়ে শুধু ব্যবসা হচ্ছে। এর থেকে অনেক বেশি মানুষ অন্য রোগে মারা যান। এটা অতি সরলীকরণ বলে মনে হয়। এই ধরণের অতিমারীতে এত মানুষের আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যু আমরা নিকট অতীতে সেভাবে দেখিনি। মৃত্যু ছাড়াও এই রোগটি থেকে যারা সুস্থ হয়ে ফিরছেন তাদের মধ্যে কি প্রভাব থাকছে এ নিয়ে কোন সম্যক ধারণা আসছে না।

দ্বিতীয় মত, হল ভয়ংকর আতংক। যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। ফলে তার জন্য একধরনের অস্পৃশ্যতা তৈরি হচ্ছে সামাজিকভাবে, যা মুমূর্ষু করোনা রোগীকে সামাজিকভাবে একঘরে করে দিচ্ছে। রোগের ওপর বাড়তি বিষফোঁড়া এই মনোভাব। সামাজিক সহৃদয় স্পর্শের বদলে এক অতিরিক্ত মানসিক চাপ রোগটিকে গোপন করার প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে। যার ফলে রোগটি একদিকে ছড়াচ্ছে আর অন্যদিকে রোগের হানিকারক প্রভাব বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও যারা সরাসরি এই রোগের বিরুদ্ধে লড়ছেন চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, আয়া বা পরোক্ষে যুক্ত মানুষদের অনেক সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে। যা এ সময়ে খুব উদ্বেগজনক। অন্ধ কুসংস্কার আমাদের রোগটি সম্পর্কে এক অজানা ভীতি তৈরি করছে যা দ্রুত কাটানো দরকার। যারা সুস্থ হয়ে ফিরছেন তারা সমাজের পক্ষে ভালো। কারণ তাদের শরীরে এ রোগের এন্টিবডি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যা আগামীদিনে herd immunity বা গোষ্ঠী অনক্রম্যতা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। ভ্যাকসিন কবে আসবে বা আদপে সফল হবে কিনা কেউ জানি না।

আমি ১৭ দিনের মাথায় আবার টেস্ট করাই যাতে রিপোর্ট আবার পজিটিভ আসে। এটা বহু ক্ষেত্রে ঘটছে। এতেও আতংক ঘটছে। ICMR এমনিতে দ্বিতীয় টেস্ট এখন করতে বলছে না। কোনটা ঠিক এ নিয়েও মতবিরোধ আছে।

কোভিড ১৯ আক্রান্ত রুগীর ৮০% হল উপসর্গহীন বা মৃদু উপসর্গযুক্ত। ১৫% হল যাদের অক্সিজেন লাগবে। ৫% সঙ্কটপূর্ণ যাদের ভেন্টিলেটর লাগবে।

উপসর্গহীন বা মৃদু উপসর্গযুক্ত তারা যাদের টেস্টে পজিটিভ হওয়া সত্ত্বেও ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ কোন রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। এই ভাইরাসের incubation বা উন্মেষ পর্ব মোটামুটি ৫-৬ দিন থেকে ১৪ দিন। কী কী উপসর্গ দেখা যেতে পারে? মূলত জ্বর, কাশি, sore throat গলা ব্যথা, Anosmia ঘ্রাণ শক্তির লোপ, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, পেট খারাপ, উদারময়, বমি, স্বাদ না পাওয়া ইত্যাদি।

তাই ৮০% রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা পেলে হয়ে যায়। যেহেতু আমাদের মত দেশে চিকিৎসক, বেড, সেবিকা ও উপযুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এর অভাব আছে তাই এই সব রুগীদের বাড়িতে ১৪দিন স্বেচ্ছা নির্বাসন ও পর্যবেক্ষণ (প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমিক চিকিৎসক পরামর্শ) বহু সঙ্কটপূর্ণ রুগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা সুগম করতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া কর্পোরেট বা বেসরকারি নার্সিং হোমের একটা বিপুল খরচ বাঁচবে। রুগী চিকিৎসা পরবর্তী খাওয়া দাওয়াতে সে খরচ করতে পারে। এরজন্য বাড়িতে প্রথম থেকেই কিছু ব্যবস্থা রাখা দরকার। vitaminC ট্যাব দিনে দুবার, বা লেবুর জল, supradyn বা কোন ভিটামিন, ORS আর প্রয়োজনে ক্যালসিয়াম বা ভিটামিন D3 (৩দিন)। এসবে জ্বরবিহীন উপসর্গ চিকিৎসা হতে পারে। জ্বর হলে প্যারাসিটামল ৩ বার বাচ্চাদের অর্ধেক ডোজ দিলে হবে। থার্মোমিটার এ জ্বরের চার্ট রাখা চালু করতে হবে। musk, ভালো সাবান দিয়ে বারবার হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব ৬ মিটারের মত বজায় রাখা এসব তো করতেই হবে। pulse oximeter রাখতে হবে। sanitise করতে হবে ঠিক মত। ৯০ এর নিচে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরী। steam inhalation ও খুব কার্যকরী। এ ছাড়া ডেরিফিলিন বা ডক্সিফিলিন, লিভসেটরিজিন montelucast combination, mucinac, যে কোন কফ সিরাপ এসব চিকিৎসকের পরামর্শে রাখা যায়। আদার রস মধু দিয়ে  খাওয়া যেতে পারে। Azythomycin বা doxycicline100 এসব antibiotic রাখা যায়। বাকি ওষুধ অর্থাৎ dexamethasone, atorvastatin, enoxaparin, favipiravir, remdesivir, Hydroxychloroquine, methylprednisolone এসব সম্পূর্ণ চিকিৎসাধীন হয়ে ওনাদের পরামর্শে নেওয়া যেতে পারে। নিজেদের কোনভাবে নেওয়া ঠিক নয়।

কখন ভর্তি হবেন? যখন দেখবেন জ্বর কমছে না, শ্বাসকষ্ট খুব হচ্ছে, বুকে ব্যথা ও pulse অক্সিমেটর-এ বোঝা যাচ্ছে, মানসিক স্থিতি নষ্ট হচ্ছে, ২৪ ঘন্টা দেখার কেউ নেই, উপসর্গহীন কিন্তু ষাটোর্ধ বা অন্য জটিল রোগ যেমন ডিয়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের comorbid এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। প্রয়োজনে safe হোমেও থাকা যায়। তবে যেহেতু কোভিড১৯ ঠিক diagnose করা যায় না তাই উপসর্গ এলে টেস্ট চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত করানো ভালো।

শেষে আবার বলি সব রোগের মত এই রোগেরও প্রকোপ কমবে। অযথা আতংক বা গুজব ছড়াবেন না। রুগীর সাথে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। সামাজিক দূরত্ব নয়। তার পাশে দাঁড়িয়ে সামাজিক কর্তব্য পালন করুন। আমি নিজেও বাড়িতে এখন quarantine আছি মায়ের সাথে। খুব ভালো বই পড়ার সুযোগ হাত ছাড়া করতে চাই না।

তথ্যসূচি:

১ ডাঃ ত্রিবর্ণা সিনহা চক্রবর্তী

Rational drug bulletin, vol. 29 issue 3 July sept 2020

(পুনশ্চ - কোনোরকম ওষুধ নিজের ইচ্ছেমত গ্রহণ করবেন না। যে কোনো ওষুধ নেবার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।)

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন