চম্বলের সংস্কৃতি খুন কা বদলা খুন। এখানকার প্রতিটা বাড়ির পেছনের দরজা খোলে বেহড়ের দিকে। এখানকার মানুষের বিশ্বাস বেহড়ের হাওয়ায় রয়েছে বিদ্রোহের হাতছানি। যার শত্রু জীবিত তার জীবনটাই বেকার। যদিও চম্বল এখন শান্ত। লুক্কা পন্ডিত, রূপা মহারাজ, গব্বর সিং থেকে পুতলীবাই, ফুলন দেবীদের আতঙ্ক এখন আর চম্বলকে তাড়া করে বেড়ায় না। কতটা শাপমুক্তি ঘটেছে চম্বলের? চম্বল ঘুরে দেখলেন শুভেন্দু দেবনাথ।

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

গল্প শুনতে শুনতে সন্ধ্যে পড়ে আসছিল। তাড়া দিলেন মহাবীর। আরেক জায়গায় যেতে হবে। ফিরে আসতে আসতে দেখছিলাম ক্ষেতে নুয়ে পড়েছে পাকা সর্ষে গাছ। মাঠ থেকে ট্রাক্টরে আলু ভরা চলছে। মহাবীর জানায় এবার খুব ভাল সর্ষে হয়েছে। জিজ্ঞেস করলো কলকাতায় চাষাবাদ হয় কিনা। দেখতে দেখতে চলে এলাম পূরণ সিঙের বাড়িতে। এখানকার গ্রামগুলোতে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মত গায়ে গায়ে লাগা বসতি নয়। প্রত্যেকটা বাড়ি দূরে দূরে। একটা বাড়ি থেকে আরেকটা বাড়ির দূরত্ব প্রায় কয়েক কিলোমিটার। মাঝখানে হয় খেত, নয়ত উঁচু নীচু গেরুয়া রঙের বেহড়। মান সিঙের চতুর্থ ছেলে সোবরণ সিঙের সন্তান পূরণ সিং। খানিকটা পড়াশুনা জানা। তিনি জানান মান সিংকে মেরে ফেলার পর সরকার মান সিঙের গড়হি আর প্রায় আট-শো বিঘা জমি সীজ করে নিয়েছিল। তেহেসীলদার সিঙ তখন জেলে। সোনবরণ, সুবেদার সিং আর রুপা মিলে চালাচ্ছে দল। সোনবরন আর সুবেদার মারা যাওয়ার পর অনেক চেষ্টা করে সেই জমি তারা ফেরত পান ১৯৫৯ সালে। সরকারই ভাগ বাটোয়ারা করে দেয় মান সিঙের নাতি নাতনীদের মধ্যে। প্রত্যেকের ভাগে প্রায় দুশো বিঘা জমি। তাদের ভাইদের কেউ বনবিভাগে কাজ করে কেউ বা বিএসএফে ছিলেন। মান সিঙের আরেক নাতি জি. এম সিং  বিএসএফের ডিআইজি হিসেবে অবসর নিয়ে এখন উত্তরপ্রদেশে থাকেন। নাতি নাতনীরা পড়াশুনা করছে গ্রামেরই স্কুলে। বলেন খেড়া রাঠোর গ্রামে পাশাপাশি বাস করে ঠাকুর, মাল্লাহ জাতের মানুষ। আগের মত জাতপাতের বালাই আর নেই। তবু জানতে চাই অন্যান্য জাতের মধ্যে বিয়ের চল আছে? তিনি জানান ‘নেহি। ঠাকুর ঠাকুর সে হি বিয়া রচায়েগা আউর মাল্লাহ লোগ মাল্লাহ সে। পেহেলি বাত কই দুসরে জাতসে বিয়া করেগাহি নেহি, আউর দুসরি বাত আগার গলতি সে কর লেতে হ্যায় তো ফসাদ হো জায়েগী’। বাইক ছেড়ে দিয়েছিলাম। হেঁটেই ফিরছি, ঠান্ডা লাগছে বেশ। মহাবীর সিং হঠাৎ পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের বোতল আর দু প্যাকেট জলের পাউচ বার করলো। আমাকে রাস্তার পাশে একটা ঢিপিতে বসিয়ে বলল খেয়ে নাও ঠান্ডা লাগবে না। ‘ম্যায় বিবিকে সামনে পিতি নেহি, গুসসা করতি হ্যায় শালী, জা খা জায়েগী ইসিলিয়ে লায়া হুঁ ছুপাকে এক কোয়ার্টার’। হেসে বলি খাবো না। তিনি রাস্তার ধারে বসেই ঢক ঢক করে জল মিশিয়ে অর্ধেক শেষ করে বাকিটা পকেটে পুরে ফেললেন।

ডাকাতের বাড়ির রাত্রিবাস ও খানাপিনা

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম বাড়ী। সেখানে তখন এলাহী ব্যবস্থা। রান্না চেপেছে। শীত করছে। মহাবীর ঘর ঢুকে বউয়ের একটা চাদর এনে দিলো আমায়। জিজ্ঞেস করলো কি ভাবে রুটি না পুরি? যা হোক হলেই হবে জানাতে বলল মহাবীর পুরি খান না গ্যাস হয়, খেলেও একটা। আরেকপ্রস্থ চায়ের অর্ডার দিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে রান্না দেখছি। মহাবীর ততক্ষণে ঘর থেকে তোষক বার করে খাটিয়ায় পাতছে। বললেন এই তোষকে উনি শোন। আজ আমার জন্য এটা উনি দিচ্ছেন। তারপর পরিপাটি করে বিছানা করে বললেন বোসো। ওর স্ত্রী যত বলেন যে ওকে বারান্দায় শুতে দাও ঠান্ডা লাগবে তিনি মানতে নারাজ। ওনার পাশের খাটিয়ায় উঠোনেই শুতে হবে। গ্রামের লোকেরা খেয়ে নেয় আটটার মধ্যেই। আমাদের খাবার চলে এলো। নিয়ে এল মহাবীরের এক নাতি। পুরি, ছোলার সবজি, ছাগলের মাংস, বড়ো লঙ্কার আচার, আর একধরনের জংলি কুলের আচার। উনি খেলেন পুরি আর গুড়ের ডেলা। গ্যাসের রুগী মাংস খাবেন না। বড়ো ছেলেকে হুকুম করলেন মোষের দুধ দুইয়ে তাজা দুধ আনতে। খাওয়া দাওয়া শেষ হলে আমার হাতে মদের গ্লাস ধরিয়ে দিলেন মহাবীর। ‘পি লে ঠন্ড নেই লগেগী’।

আরও পড়ুন - 

খাওয়া দাওয়া শেষ করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়েছি। ঘুম আসছে না। উঠোনে ব্যাটারিতে জ্বলছে সিএফএল বাল্ব। ঘর থেকে আসছে হিন্দি সিরিয়ালের আওয়াজ। সামনেই দোল পূর্নিমার চাঁদের আলোয় অদ্ভূত দেখাচ্ছে পুরো জায়গাটাকে। আমার সামনে উঠোনের লাগোয়া সর্ষে খেত ডাইনে বায়ে প্রকান্ড বড়ো একটা বেহড়। শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। হ্যান্ড ব্যাগটা পাশে রাখা ছিল। তার মধ্যে থেকে বার করলাম অভিশপ্ত চম্বল বইটি। কিছুটা পড়া বাকি আছে। অদ্ভূত এক সমাপাতন আজ থেকে ষাট সত্তর বছর আগে মান সিং এই চম্বলে এক বেহড় থেকে আরেক বেহড়ে  আতঙ্ক ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। আর আমি আজ তারই বাড়ির উঠোনে বসে তার সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী পড়ছি। হঠাৎ সরসর আওয়াজ হতে দেখলাম অন্ধকারে একটা ছায়া মূর্তি আসছে। ‘কৌন’? ‘ভাইয়া ম্যায় আপকো বাইকে ঘুমানে লে গয়ে থে’। মহাবীরের নাতি? এত রাতে কোথা থেকে। গ্রামের বিয়েতে দাওয়াত খেয়ে আসছে। রাত দেড়টা। ডাকাত কিংম্বা জংলি জন্তুর ভয় নেই? ‘আভি চম্বল মে ডাকু হ্যায় নেহি। আউর বাকি সাপ উপ হ্যায় পর চলতা হ্যায়’। বলেই হাঁটা দিল ঘরে। পড়তে পড়তে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। তারপরই সেই বাইক কান্ড।

একবার ঘুম ভাঙায় আর আসছিল না। পাশ থেকে আওয়াজ এলো ‘ডর লগ রহা হ্যায়’? তাকিয়ে দেখি মহাবীর উঠে বসেছে। হাসলাম। বিড়ি ধরিয়েছে। আমাকে ভয় পাওয়ানোর জন্য বলল ‘ওহ দেখো’ সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি আমার প্রায় এক হাত দূর থেকে হেলে দুলে চলে যাচ্ছে প্রায় দশ বারো ফুটের একটা সাপ। ‘অজগর, আব ইয়ে হি হ্যায় চম্বল কি ডাকু’। এরপর আর কারো ঘুম আসে?

(ক্রমশ)

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন