[গত ১৫.০৯.১৯ থেকে শুরু হয়েছে উদ্দালক আচার্যর কলমে পিপলস রিপোর্টারের বিশেষ প্রতিবেদন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, হিন্দুত্ববাদ, জম্মু-কাশ্মীর। আজ ষষ্ঠ পর্ব। আগের পাঁচটি পর্ব পড়তে নিবন্ধের মধ্যে থাকা লিঙ্কে ক্লিক করুন]

প্রথম লোকসভা নির্বাচন

প্রথম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে  ১৯৫২ সালের  ২১ ফেব্রুয়ারি। হিন্দু মহাসভা এবং জনসংঘ উভয়েই নির্বাচনে অংশ নেয়। শ্যামাপ্রসাদের নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রীয় বিষয়ই ছিল হিন্দুত্ববাদী বিভাজনের রাজনীতি। ‘সেকুলারাইটিস ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন রোগ’ — নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। (৪২)

কিন্তু ভোটে হিন্দুত্ববাদীদের পরিণতি ছিল শোচনীয়। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি সাধারণ ভোটাররা মেনে নেয়নি। ভারতীয় জনসংঘ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে লোকসভায় তিনটি আসন লাভ করে।  তার মধ্যে দু’টি পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতা দক্ষিণপূর্ব কেন্দ্রে জনসংঘের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন শ্যামাপ্রসাদ। মেদিনীপুর ঝাড়গ্রাম আসনে জেতে জনসংঘের দূর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিখ্যাত ব্যারিস্টার এন সি চ্যাটার্জি জিতেছিলেন হুগলি আসনে হিন্দু মহাসভা প্রার্থী হিসেবে। শ্যামাপ্রসাদ এবং এন সি চ্যাটার্জি দু’জনেই জিতেছিলেন অনেকটাই ব্যক্তিগত পরিচিতির জোরে। ওই দুই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে জনসংঘ বা হিন্দু মহাসভার প্রাপ্তি প্রায় কিছুই ছিল না। লোকসভায় গোটা দেশে হিন্দু মহাসভা ৪টি আসন পায়। এছাড়া আরও একটি হিন্দুত্ববাদী দল রামরাজ্য পরিষদ জেতে ৩টি আসনে। অন্যদিকে সি পি আই জেতে ১৬টি আসনে, পশ্চিমবঙ্গে ৫টি। কংগ্রেস ৩৬৪টি আসনে। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মৃত্যুর পর ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে কলকাতা দক্ষিণপূর্ব কেন্দ্রে উপনির্বাচন হলে জনসংঘ প্রার্থী হেরে যান, জয়লাভ করেন সি পি আই-র সাধন গুপ্ত।

এন সি চ্যাটার্জির রাজনৈতিক জীবন তাৎপর্যপূর্ণ মোড় নেয় ১৯৬৩ সালে তৃতীয় লোকসভা নির্বাচনের সময়, যখন তিনি বর্ধমান লোকসভা কেন্দ্র থেকে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। পশ্চিমবঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালনের সূত্রেই এন সি চ্যাটার্জি কমিউনিস্ট নেতৃত্বের সংস্পর্শে আসেন। তাঁর পুত্র এবং পরবর্তীকালে বিখ্যাত সাংসদ সোমনাথ চ্যাটার্জি তাঁর আত্মজীবনী ‘আস্থার আশ্রয়ে: সাংসদের স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে (আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত, ২০১২) পিতার রাজনৈতিক জীবনের রূপান্তর সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। চতুর্থ লোকসভা নির্বাচনেও (১৯৬৭) এন সি চ্যাটার্জি বর্ধমান লোকসভা আসন থেকে সি পি আই (এম) সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। হিন্দু মহাসভার নেতা থেকে ৬৭ বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত প্রার্থী -- এন সি চ্যাটার্জির জীবন ও চিন্তার চলিষ্ণুতা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ক্রমরূপান্তরেরও অন্যতম সূচক।

আরও পড়ুন - 

পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫২ সালে নির্বাচন হয় ২৩৮টি বিধানসভার আসনে। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার ৭টি বিধানসভা কেন্দ্রে (ঝাড়গ্রাম, নারায়নগঞ্জ, পিংলা, দাঁতন, পটাশপুর, মোহনপুর, ভগবানপুর) জনসংঘ এবং বাঁকুড়ার ছাতনা বিধানসভা কেন্দ্রে হিন্দু মহাসভা প্রার্থী জয়লাভ করেন। সিপিআই জয়লাভ করে ২৮টি আসনে। কংগ্রেস জয়লাভ করে ১৫০টি আসনে। জনসংঘ ঐ সময় বিধানসভা ভোটে বাংলা প্রদেশে ৮টি আসন ও রাজস্থানে ৮টি আসন লাভ করে।

পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা দেশে সাধারণ মানুষ যে শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তা স্পষ্ট হয়ে যায় প্রথম সাধারণ নির্বাচনেই। সংঘ পরিবার প্রথম লোকসভায় হিন্দুত্ববাদী দলগুলির নেতৃত্বে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকেই নির্বাচিত করে। শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন পর্ব।

কাশ্মীরে অভিযান

মন্ত্রিসভায় থাকাকালীন যেটুকু বাধ্যবাধকতা ছিল নতুন পর্বে সেটুকুও আর দরকার পড়ছিল না শ্যামাপ্রসাদের। প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ঠিক পরই দিল্লিতে শেখ আবদুল্লাহর সঙ্গে ভারত সরকারের চুক্তি সাক্ষরিত হয় ১৯৫২ সালের ২৪ জুলাই। সেই দিল্লি চুক্তির বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে সংঘ পরিবার তাদের নির্বাচনী ব্যর্থতাকে পুষিয়ে নেবার চেষ্টায় নামে। ১৯৫৩ সালের মে মাসে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সদলবলে জম্মু-কাশ্মীর অভিযান ছিল দিল্লি চুক্তি-বিরোধী কর্মসূচীর চূড়ান্ত পর্ব।

দিল্লি চুক্তিতে ভারতের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন এবং রাজ্যের মধ্যে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন স্বীকৃত হয়। জম্মু-কাশ্মীরের  নিজস্ব সংবিধান রচনা প্রক্রিয়া চলাকালীন এই চুক্তির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এই চুক্তি অনুযায়ীই ১৯৫৪ সালে ভারতীয় সংবিধানে ৩৫-এ ধারা যুক্ত হয়। জম্মু-কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দা চিহ্নিত করার  অধিকার রাজ্যের আইনসভার ওপর ন্যস্ত হয়।

কাশ্মীরের হিন্দু রাজা হরি সিং ছিলেন ‘স্বাধীন’ জম্মু-কাশ্মীরের পক্ষে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট হরি সিং এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে ‘স্থিতাবস্থা’ (স্ট্যান্ড স্টিল) চুক্তিতে সাক্ষর করেন। নেহরু সরকার মহারাজার সঙ্গে এমন কোন চুক্তি সাক্ষরে রাজি ছিল না। ‘স্বাধীন’ কাশ্মীরের পক্ষে মহারাজার অবস্থানে হিন্দুত্ববাদীদের  প্রথম দিকে আপত্তি ছিল না।  রাজতন্ত্রই জম্মু-কাশ্মীরে ‘হিন্দু-তন্ত্র’কে নিরাপদ রাখতে পারে, ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণতান্ত্রিক ভারতে ‘হিন্দু’ জম্মু-কাশ্মীরের স্থান নেই নয় --  এই বোধ হিন্দুত্ববাদীদের অজ্ঞাত ছিল না। হিন্দুত্ববাদীরা ৩৭০ ধারার বিরোধিতা করে; কিন্তু হরি সিং-র ‘স্বাধীন’ কাশ্মীর নীতির সমালোচনা করে না। জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা থাকায় হিন্দুত্ববাদীরা সেরাজ্যকে ‘হিন্দু-রাজ্য’ বলেই বিবেচনা করতো। বিনায়ক সাভারকার ১৯৪২-র ৩১ জুলাই বলেন, ‘‘I wish that the Moslems in Kashmir do not forget that they are subjects of a Hindu state...’’। (৪৩)

সংঘ পরিবারের উদ্যোগে মহারাজা হরি সিং-র জন্মদিন সরকারীভাবে পালনের সাম্প্রতিক হিড়িকের ঐতিহাসিক যোগসূত্র দুর্বোধ্য নয়। 

১৯৪৭-র ২২ অক্টোবর পাক আক্রমণের পর মহারাজা হরি সিং ২৬ অক্টোবর ভারতভূক্তির চুক্তিতে সই করেন।

গণপরিষদে ১৯৪৯ সালের ১২ মে থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত আলোচনার পর ৩৭০ ধারা গৃহীত হয়। বস্তুতপক্ষে সর্দার প্যাটেলের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানেই তা গৃহীত হয়। ৩৭০ ধারা গৃহীত হবার সময় প্রধানমন্ত্রী নেহরু দেশেই ছিলেন না। ১১ অক্টোবর থেকে ৪ নভেম্বর নেহরু ছিলেন আমেরিকায় ও কানাডায়।

তবে,পাকিস্তানী হানাদাররা কাশ্মীর আক্রমণ করলে রাজ্যবাসীকে ফেলে রেখে মহারাজা হরি সিং এবং তাঁর প্রধানমন্ত্রী মেহেরচাঁদ মহাজন কাশ্মীর ছেড়ে চলে যান।

জনমতের চাপে ১৯৪৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা শেখ আবদুল্লাহকে মহারাজা কারাগার থেকে মুক্তি দেন। মহারাজার বিরুদ্ধে ‘কুইট কাশ্মীর’ (‘কাশ্মীর ছাড়ো’) আন্দোলনের দায়ে ১৯৪৬ সালের মে মাসে রাজ প্রশাসন তাঁকে গ্রেপ্তার করে। প্রসঙ্গত, সেই সময় নেহরু শ্রীনগর গিয়ে শেখ আবদুল্লাহের সমর্থনে মামলা লড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজপ্রশাসন তাঁকে জোর করে ফেরত পাঠিয়ে দেন। প্রসঙ্গত, শেখ আবদুল্লাহের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ১৯৪৬ সালের ২১ জুলাই ‘কাশ্মীর সালাম দিবস’ পালিত হয় ভারত জুড়ে। ১৯৪৭ সালের ১-৫ আগস্ট মহাত্মা গান্ধী শ্রীনগর সফরে গিয়ে মহারাজের সঙ্গে বৈঠক করেন। তখনও মহারাজ ভারতভূক্তি নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি।

ভারতভূক্তির চুক্তির তিনদিন পর, ৩০ অক্টোবর (১৯৪৭) শেখ আবদুল্লাহ মহারাজার জরুরী প্রশাসনের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। পাক হানাদারি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সংগ্রামে জম্মু-কাশ্মীরবাসীকে নেতৃত্ব দেন কার্যত শেখ আবদুল্লাহ।

সংঘ পরিবার এসময় বসেছিল না। ১৯৪৭ সালের ১৭ নভেম্বর জম্মুতে তারা গড়ে তোলে নতুন সংগঠন প্রজা পরিষদ। যার মূল সংগঠকদের মধ্যে ছিলেন প্রেমনাথ ডোগরা, বলরাজ মাধোক প্রমুখ।

ভারতভুক্তি নিয়ে মহারাজার সংশয় পরেও ছিল। সর্দার প্যাটেলকে  ১৯৪৮-র ৩১ জানুয়ারি লেখা চিঠিতে দেখা যায় আক্ষেপ করছেন মহারাজা। লিখছেন: ‘‘কখনও কখনও আমার মনে হয় ভারতে যোগদানের যে সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছি তা প্রত্যাহার করে নিই।’’  (৪৪)

আরও পড়ুন - 

অন্যদিকে, ১৯৪৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রসঙ্ঘের  নিরাপত্তা পরিষদে শেখ আবদুল্লাহ বলেন, ‘‘মুসলিম এবং হিন্দু আলাদা জাতি এই সূত্র আমি এবং আমার সংগঠন কখনও মেনে নিইনি। আমরা দ্বিজাতি তত্বে বিশ্বাস করি না, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে বিশ্বাস করি না; সাম্প্রদায়িকতাবাদেই বিশ্বাস করি না।আমাদের বিশ্বাস, রাজনীতিতে ধর্মের কোন স্থান নেই।’’

তাঁর ভাষণে শেখ আবদুল্লাহ কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তান সরকারের ভূমিকাকে একেবারে নস্যাৎ করে দেন। বলেন: ‘‘নিরাপত্তা পরিষদের কাছে আমরা প্রমাণ করে দেব যে কাশ্মীর এবং কাশ্মীরের জনগন আইন এবং সংবিধান মেনে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এনিয়ে  কোন প্রশ্ন তোলার অধিকার নেই পাকিস্তানের।’’(৪৫)

১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ শেখ আবদুল্লাহ জম্মু-কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন। তখনও জম্মু-কাশ্মীরের প্রশাসন প্রধান মহারাজা। যদিও তাঁর জনপ্রিয়তা তখন তলানিতে। ১৯৪৯ সালের ২০ জুন হরি সিং দায়িত্বভার ছেড়ে দিতে বাধ্য হন যুবরাজ করণ সিং-র হাতে। আঠারো বছরের করণ সিং নিযুক্ত হন রিজেন্ট। গণপরিষদের অধিবেশনে ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ ধারা যুক্ত হয়।  ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হলে জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও তা কার্যকর হয় রাষ্ট্রপতির নির্দেশে।

শেখ আবদুল্লাহ প্রশাসনের ভূমিসংস্কার কর্মসূচীও হিন্দুত্ববাদীদের উষ্মার অন্যতম কারনে পরিণত হয়। ১৯৫০ সালের ১৭ অক্টোবর রাজ্য সরকার বিগ ল্যান্ডেড এস্টেটস অ্যাবলিশন অ্যাক্ট জারি করে। এই আইন বলে জমির মালিকানার উর্ধসীমা কমিয়ে আনা হয় ১৮২ কানালে (৮ কানাল প্রায় ১ একরের সমান)।

আরও পড়ুন - 

হরি সিং-র রাজত্বে জমির মালিক ছিল মুখ্যত হিন্দুরা, আর কৃষকরা ছিল মুখ্যত মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত। নতুন ভূমিসংস্কার আইনে রাজতন্ত্রের সুবিধাভোগী এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১৯৫১ সালের ১ মে রাজ্যের প্রধান হিসেবে করণ সিং জম্মু-কাশ্মীরের জন্য গণপরিষদ গঠনের নির্দেশ জারি করেন। গণপরিষদ গঠনের জন্য ১৯৫১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর জম্মু-কাশ্মীরে ভোটগ্রহণ হয়। বিপুল গরিষ্ঠতায় বিজয়ী হয় ন্যাশনাল কনফারেন্স। ১০ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে একসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহ বলেন, যে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কাশ্মীর তা অস্বীকার করায় পাকিস্তানের ভিত টলে গেছে। (৪৬) ৩১ অক্টোবর গণপরিষদ কাজ শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী পদে  আবার শপথ নেন শেখ আবদুল্লাহ। জম্মু-কাশ্মীরের গণপরিষদে রাজ্যের সংবিধান রচনার কাজ শুরু হয়।

দিল্লি সম্মেলন থেকে শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে জনসংঘ গঠিত হয় এমনই প্রেক্ষাপটে। শ্রেণীস্বার্থগত কারনেই শেখ আবদুল্লাহ সরকারকে বরদাস্ত করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

আরও পড়ুন - 

প্রথম লোকসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জম্মু-কাশ্মীর বিষয়ে উল্লেযোগ্য ঘটনা ছিল ১৯৫২-র ৭ জুন জম্মু-কাশ্মীরের নিজস্ব সরকারী পতাকা চালু করা নিয়ে রাজ্য গণপরিষদে সিদ্ধান্ত, ১২ জুন রাজন্যপ্রথার বিলুপ্তি ঘটিয়ে জম্মু-কাশ্মীরে গণপরিষদে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২৪ জুলাই দিল্লিতে শেখ আবদুল্লাহর সঙ্গে কেন্দ্রের নেহরু সরকার চুক্তি সাক্ষর করে।

দিল্লি চুক্তির পর জম্মু-কাশ্মীর গণপরিষদের অনুরোধে রাষ্ট্রপতি ১৫ নভেম্বর নির্দেশনামা জারি করেন ৩৭০ ধারার সংশোধন করে। এই সংশোধনীতে মহারাজার জায়গায় নির্বাচিত রাজ্যপ্রধান বা  ‘সদর-ই-রিয়াসত’ পদে নিযুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। জম্মু-কাশ্মীর গণপরিষদ ১৭ নভেম্বর যুবরাজ করণ সিং-কে  ‘সদর-ই-রিয়াসত’ পদে নির্বাচিত করে।

বলাবাহুল্য, রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে নির্বাচিত রাজ্যপ্রধান হওয়ার বিষয়টি করণ সিং পছন্দ করেননি। প্রজা পরিষদ নেতাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন। বলাবাহুল্য, প্রজাপরিষদ তীব্রভাবে শেখ আবদুল্লাহের বিরোধিতা করছিল। শেষপর্যন্ত করণ সিং নতুন ব্যবস্থা মেনে নেন  বা মেনে নিতে বাধ্য হন নেহরুর কথায়। ১৯৮২ সালে প্রথম প্রকাশিত আত্মজীবনীতে করণ সিং বিস্তারিত লিখেছেন। আত্মজীবনী পড়লে বোঝা যায়  শেখ আবদুল্লাহ সম্পর্কে করণ সিং তাঁর পিতার মতই বিতরাগ পোষণ করেছেন চিরকাল। (৪৭)

আরও পড়ুন - 

প্রজা পরিষদসহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি সেই সময় ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের দাবি তুলে, কখনও কখনও জম্মু ও লাদাখকে পৃথক দাবির অজুহাত দেখিয়ে জম্মু-কাশ্মীর সমস্যার গণতান্ত্রিক নিষ্পত্তির সম্ভাবনাগুলিকে দুর্বল করার পথ নেয়। জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে তাদের হল্লার মূলে সংঘপরিবারের মৌলিক অবস্থান। যে অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সম্প্রদায়গত বহুত্ববাদের কোনো স্থান নেই। হিন্দুত্ববাদীরা রাজ্যগুলির ‘ইউনিয়ন’-র ধারণাকেই সমর্থন করে না, স্বায়ত্তশাসন তো দূরের কথা। গোলওয়ালকারের ‘বাঞ্চ অফ থটস’ পড়লেই তা স্পষ্ট।

তথ্যসূত্র:

(৪২) Sekhar Bandyopadhyay, Decolonization in South Asia: Meanings of Freedom in Post-independence West Bengal, 1947–52, Routledge, 2009, p.166

(৪৩)‘To the Muslims in Kashmir’ (31-07-1942) in V. D. Savarkar, Historic Statements,Bombay: G. P. Parchure, 1967

(Link: http://savarkar.org/en/encyc/2017/5/23/2_12_15_55_historic_statements_by_savarkar.v001.pdf_1.pdf

(৪৪) https://ikashmir.net/historicaldocuments/maharaja2sardar.html

 (৪৫)https://www.satp.org/satporgtp/countries/india/states/jandk/documents/papers/excerpts_of_sheikh_abdullah's_february_5_1948_speech.htm

(৪৬) যুগান্তর ১২ সেপ্টম্বর ১৯৫১

(৪৭) Karan Singh, Autobiography, (New Delhi: OUP, 2014)

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন