শবরীমালা মন্দিরে সব বয়সের নারীর প্রবেশাধিকার নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে কেরলে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে বিজেপি এবং সেখানকার কংগ্রেসের প্রাদেশিক শাখা এক সঙ্গে কার্যত পথে নেমেছে।

কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্ব শবরীমালা মন্দিরকে কেন্দ্র করে সুপ্রীম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানালেও তাঁদের প্রাদেশিক শাখা একই প্রশ্নে কেরলের বামপন্থী সরকারকে অসুবিধায় ফেলতে এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে এমন দৃষ্টিভঙ্গী অবলম্বন করেছে যাতে প্রকারান্তে সে রাজ্যে আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিই আখেরে রাজনৈতিক ফায়দা লুটছে। সুপ্রীম কোর্টের রায়কে যে সে রাজ্যের বাম-গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকার মেনে নিয়েছে - এটা সাম্প্রদায়িক শিবিরের যেমন গাত্রদাহের বিষয় হয়েছে, তেমনই এটা বিরক্তির বিষয় হয়েছে কংগ্রেসের প্রাদেশিক শাখার।

আর এস এস বা তাদের শাখা সংগঠনগুলি কিংবা তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি কেন সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্ত মানবে না, সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবে - তার কারণ সহজেই অনুমান করতে পারা যায়। ধর্মান্ধতা, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার, ধর্মের নামে সশস্ত্র কার্যকলাপ, জাতপাতের পাশাখেলা - এসবই হল রাজনৈতিক হিন্দুদের চলার পথের সম্বল। এসবগুলি না থাকলে রাজনৈতিক হিন্দুরা তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ চালাতে পারবে না। তাই স্বাভাবিক কারণেই আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি শবরীমালা মন্দিরে সব বয়সের নারীদের প্রবেশের স্বীকৃতি ঘিরে রাজনৈতিক আসর গরম করার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি " সাম্প্রদায়িকতা"কে বিস্তৃত করে তুলতে চাইছে।

শবরীমালা মন্দিরে সব বয়সী নারীর প্রবেশাধিকার নিয়ে সুপ্রীম কোর্টের সম্মতি সূচক নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আর এস এস-বিজেপি চেয়েছিল রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করুক রাজ্য সরকার। প্রকাশ্যে এ কথা না বললেও প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বের ভাবগতি ও ছিল অনেকটা একই রকমের। রাজ্য সরকার রায় পুনর্বিবেচনার জন্যে সুপ্রীম কোর্টের দ্বারস্থ না হওয়ার কারণে গত বেশ কয়েকদিন ধরেই আর এস এস এবং তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি নানা ভাবে রাজ্য সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশে গোটা কেরল জুড়ে আন্দোলনের নামে অরাজকতার পরিবেশ তৈরি করতে শুরু করেছে।

প্রায় একই ঢঙে প্রদেশ কংগ্রেস ও গোটা কেরল জুড়ে আন্দোলনের নামে অরাজকতা তৈরি করে চলেছে। প্রদেশ কংগ্রেসের এই তথাকথিত আন্দোলনের জেরে রাজনৈতিক হিন্দুরাই কিন্তু সার্বিক ভাবে লাভবান হচ্ছে। আশ্চর্ষের বিষয় হলো এই যে, কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্ব এই ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে সমর্থন করলেও তাঁদের কেরল প্রাদেশিক শাখা যে সাম্প্রদায়িক অবস্থান নিচ্ছে - তাকে ঘিরে ওঁদের জাতীয় নেতৃত্বের কোনো হেলদোল নেই।

পাথানামিথিত্তার পান্ডালাম থেকে সুপ্রীম কোর্টের আদেশের পরিপ্রক্ষিতে সম্প্রতি একটি সশস্ত্র মিছিল করেছিল রাজনৈতিক হিন্দুরা। এই মিছিলে বিজেপির রাজ্য সভাপতি পি এস শ্রীধরণ পিল্লাই এবং আর এস এসের অন্যতম উগ্র শাখা সংগঠন "ভারতধর্ম জনসেনা"র সভাপতি তুষার ভেল্লাপল্লি অংশ নিয়েছিলেন। এই মিছিলে বেশ কিছু মহিলাকেও অংশ নিতে দেখা যায়। ধর্মীয় ভাবাবেগকে আশ্রয় করেই রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী শিবির শবরীমালা মন্দিরে সব বয়সী মহিলাদের প্রবেশাধিকারকে ঘিরে মেয়েদের সমানাধিকারের যে প্রশ্নটি সামনে উঠে এসেছে, সেই প্রশ্নটি থেকে এভাবেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে চায়। সমানাধিকারের প্রশ্নটিকে তাঁরা আড়াল করতে চায় ধর্মীয় ভাবাবেগের মাধ্যমে। ধর্মীয় ভাবাবেগকে অবলম্বন করে মহিলাদের ভিতরেও সমানাধিকারের প্রশ্নে এভাবেই তাঁরা বিভ্রান্তির পরিবেশ রচনা করতে চায়। বিক্ষোভকারীরা কেরালার দেবাশ্বম মন্ত্রীকে কালো পতাকা দেখিয়ে বিষয়টিকে একটা রাজনৈতিক অভিঘাতের দিকেও টেনে নিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে ওই মিছিল থেকে।

বস্তুত কেরলকে টার্গেট করে এবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে গোটা রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি। বহুদিন ধরেই কেরলের ছাত্র সমাজ আর এস এসের টার্গেট। সেখানকার বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলিকে শায়েস্তা করার জন্যে আর এস এস তাদের ছাত্র সংগঠন "অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী" পরিষদকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে চলেছে। এ বি ভি পি এবং সরাসরি আর এস এসের হাতে কেরলের লড়াকু ছাত্র সমাজের অনেকেই শহিদ হয়েছেন। বস্তুত ছাত্র-যুব সমাজের ভিতরে আর এস এস তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি "সাম্প্রদায়িকতা"কে ছড়িয়ে দিতে অনেক দিন ধরেই তৎপর।

গত বিধানসভা নির্বাচনে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর হিন্দু সাম্প্রদায়িক শিবিরের এই তৎপরতা আরো অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই তৎপরতা কে একটা সামাজিক রূপ দিতে তারা এখন বেছে নিয়েছে শবরীমালা মন্দিরে সমস্ত বয়সের নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশের প্রেক্ষিতকে। এইভাবে তারা কেরলের সামাজিক জীবনে একটা বিভাজন আনতে তৎপর হয়ে উঠেছে।

কেরালাতে শবরীমালা মন্দিরকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদীদের তৎপরতা প্রসঙ্গে সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হল এই যে, সুপ্রীম কোর্টের অনুধ্যানের বিরোধিতা করে যেসব মিছিল হচ্ছে, সেইসব মিছিলগুলিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন মহিলারাই।

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন