মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুতুল পোড়ানোর "অপরাধে" শিলিগুড়ির গণ আন্দোলনের কর্মী সুকৃতি আশ-কে গ্রেপ্তার করে রাজ্য পুলিশ। আদালত তাঁকে পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। সুকৃতির গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গোটা রাজ্য জুড়ে সিপিআই(এম) কর্মী-সমর্থকেরা প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠেন। রাজ্যের বহু জায়গায় সুকৃতির সমর্থনে তাঁরা সভা সমিতি করেন। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতীকী কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। অবশেষে আদালতের নির্দেশে শারদ উৎসবের প্রারম্ভেই সুকৃতি মুক্তি পান। সুকৃতির মুক্তি সকলেরই মনে একসঙ্গে স্বস্তি এবং কিছু প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়েছে।

এ রাজ্যে একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার আছে। গণতন্ত্রের যা রীতি, তাতে একাংশের মানুষ সরকারের সমর্থক হবেন। একাংশ সরকার বিরোধী হবেন। এটাই গণতন্ত্রের দস্তুর। সরকারের পক্ষের মানুষদের ও যেমন অনেক কিছু বলার অধিকার থাকবে, তেমনিই সরকার বিরোধীদেরও থাকবে সরকারের বিরোধিতার অধিকার। সরকার ক্ষমতা, পুলিশতন্ত্র, রাষ্ট্রযন্ত্রের জেরে বিরোধীদের অধিকার কেড়ে নিতে পারেন না। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার বিরোধিতা গণতন্ত্রেরই একটি সুস্থতার লক্ষণ। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শাসকের প্রতীকী কুশপুতুল পোড়ানো জাতীয় আন্দোলনের সময়কাল থেকে আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এ কাজ স্বদেশবাসী করেছেন। কংগ্রেসী আমলে, স্বাধীনতার পরে এ কাজ বামপন্থীরা কংগ্রেসী শাসকদের বিরুদ্ধে করেছেন। বাম আমলেও এই একই কাজ আজকের মুখ্যমন্ত্রীর কর্মী, সমর্থকেরা বাম শাসকদের বিরুদ্ধে করেছেন। ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ সরকারের কুশপুতুল পোড়ালে যে শাস্তি দেশবাসীর কপালে জুটতো, সে শাস্তি কখনোই দেশবাসী কংগ্রেসী বা বাম আমলে পাননি। তাহলে আজ পাচ্ছেন কেন? মানুষের প্রতীকী প্রতিবাদের রাস্তাটিও কি রাজ্য সরকার পুলিশের ভয় দেখিয়ে বন্ধ করে দিতে চান?

তাঁর কুশপুতুল পোড়ানোর "অপরাধে" সুকৃতি আশের গ্রেফতারে কি আদৌ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সম্মতি আছে? বিষয়টি কি রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমির সেই বহু পঠিত পঙতির মতো;" বাবু যতো বলে পারিষদগণ বলে তার শতগুণ" এর মতো হয়ে যাচ্ছে না কি? সরকার বিরোধী প্রতিবাদের মাশুল হিসেবে বামপন্থী কর্মী সুকৃতি আশের হাজতবাস নিয়ে সরকারের প্রথম সারির কর্তা ব্যক্তিরা যতো নীরবতা পালন করবেন, সাধারণ মানুষ, তাঁরা সরকারের পক্ষের মানুষ হতে পারেন, আবার বিপক্ষের মানুষ হতে পারেন - প্রত্যেকের মনেই প্রশ্নটা তীব্র হতে থাকবে। বাম শাসনের শেষ কয়েক বছর পুলিশের কৃতকর্মের দায় কিন্তু বর্তেছিল বাম শাসকদেরই উপরে, তেমনিই সুকৃতি আশদের নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পুলিশ যদি আজ "অতি সক্রিয়তা" দেখান, তাহলে আখেরে পুলিশ নয়, তার দায় বর্তাবে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সতীর্থদেরই উপরে। মুখ্যমন্ত্রী যদি এই বিষয়ে এই মুহূর্তেই তাঁর দৃষ্টি নিক্ষেপ না করেন তাহলে আগামীদিন আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

সুকৃতি আশ যেহেতু সিপিআই(এম) কর্মী, তাই তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট দলের বাইরে অন্যান্য বামপন্থী দলের নেতা কর্মীদের অনুপস্থিতি যথেষ্ট বেদনাদায়ক। এখনো যদি অ সিপিআই(এম) দলগুলি মনে করেন প্রশাসনিক বা শাসকের রাজনৈতিক ছোবল পড়েছে সিপিআই(এম)-এর উপর, তাতে আমাদের কি এলো গেলো, তাহলে সেইসব দলগুলো যেটুকু অস্তিত্ব তাঁদের এখনো টিকে আছে, তা নিয়ে আগামী দিনে টিকে থাকতে পারবেন তো? শাসকের প্রবণতা হলো, ছলে বলে কৌশলে, লোভ দেখিয়ে, নয়তো ভয় দেখিয়ে নিজের দল ভারী করা। সেই দল ভারী করার খেলার থাবায় অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিস্তরে অ সিপিআই(এম) দলগুলি ইতিমধ্যেই পড়েছেন। তাই তাঁদের এই সঙ্কটে আরো গায়ে গা লাগিয়ে, প্রাণে প্রাণ স্পর্শ করে থাকাটাই কি অধিক রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের পরিচায়ক নয়? আজ আর সমস্যাটা কেবল সুকৃতি আশ সিপিআই(এম) করেন, সুতরাং সমস্যাটা সিপি আই(এম) বুঝুক - এমনটা নয়। কিংবা চৌত্রিশ বছর ধরে সিপিআই(এম) অন্য বাম দল গুলিকে কোনঠাসা করে রাখতে চেয়েছিল, এখন; " দ্যাখ, কেমন লাগে"ও নয়। পাশের চালে আগুন লাগলে আমার ঘরও যে নিরাপদ থাকে না বন্ধু।

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন