দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধির বাজারে পকেটে টান সকলের। তাও টেনেটুনে একাকদিন সাদা গরম ভাত সাথে রুপোলি ফসল দিয়ে দুপুরের খাবারটাও সারতে পারেন। বাইরে বেরোনোর ইচ্ছা না থাকলে, সাথে সাথে গায়ে চাদর চাপা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে ও নিতে পারেন।

কিন্তু ওই সাদা ফসল ফলানো কৃষক পারেন না ঘরে বসে থাকতে। অন্নদাতা সদা ব্যস্ত। আলপথ পেরিয়ে, কাদা চটকে, রোদ-বৃষ্টি ভিজে সকাল থেকে রাত চাষের জমিতে পড়ে থাকা। কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতায় কৃষক বুঝে গেছে, পরিবারের সকলের গতর না খাটালে ফসলের দাম উঠবে না। মহাজনের কাছে ঋণ শোধ করা যাবে না। সেখানেও গতর খাটিয়ে ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

 ২ ঘণ্টা পর আপনি যখন ঘুম থেকে উঠবেন,  আপনার অজান্তেই দেশে কৃষক আত্মহত্যার লিস্টে গড়ে ৪ জন কৃষক যুক্ত হয়ে গেছে। কারণ দেশে এখন গড়ে প্রতি ৩০ মিনিটে ১ জন কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।

তবু কেন্দ্রীয় সরকার বলবে কৃষকরা সুখে আছে। বাংলার সরকার বলবে - আমাদের রাজ্যে কৃষক ভালো আছে; রাজ্যে কৃষকদের আয় আড়াই গুণ অথবা চার গুণ বেড়ে গেছে বলে প্রচার সারবেন। কিন্তু তাই কি?

গত সাত বছরে পশ্চিমবঙ্গে ২০০ জনের উপর কৃষক আত্মহত্যা?

যদিও আত্মহত্যাকে কেন্দ্র রাজ্য দুই সরকারই পারিবারিক কারণ, প্রেমের কারণে বিবাদে মৃত্যু বলে সাফাই দিয়েছে।  কৃষক পরিবারের কাছে এটাই ঘায়ের উপর নুনের ছিটের সমান!

কৃষক তাদের নিজের জীবন অভিজ্ঞতায় বুঝছেন, গত কয়েক বছরে সার, কীটনাশক, বীজ, ডিজেল/বিদ্যুৎ-এর দাম কতো বেড়েছে। আর ফসলের দাম? বলছিলাম যে গতর বেচে ফসলের দাম তোলা! হ্যাঁ, নিজের গতর না থাকলে কৃষকের উৎপাদন মূল্য ওঠে না।

লোকসভা  নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারে মোদী সরকার কতটা কৃষক প্রেমী তা প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দেশের বুকে ‘আচ্ছে দিন’ সম্পূর্ণ রূপে এসে যাবার পর এবার মোদি সরকার বলেছে আগামী ২০২২-এ কৃষকের আয় দ্বিগুণ হবে;  সেই শুনে একজন কৃষক টিভি বন্ধ করে দিতেই পারেন। ‘মন কি বাত’ শুনে কৃষকের মনে ক্ষোভ জাগতেই পারে। কিন্তু তাতে প্রচার থামবে যদি ভেবে থাকবেন তাহলে ভুল ভাবছেন।

এদিকে রাজ্য সরকার-এর দাবি জমি থেকে কৃষক মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আয় করছে। বাস্তবে যদি তাই হতো কৃষক পরিবারের ছেলে মেয়ে কৃষি ফেলে কি অন্য কাজের খোঁজে বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে বেড়াতো?   তবু তিনিও বলে যাবেন।

২০১৪ তে বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল, কৃষকের ফসলের লাভজনক দাম। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ। কোটি কোটি কৃষক বিজেপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে। তারপর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কেবল, প্রতিশ্রুতিই থেকে গেছে।

দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে মান্ধাতা আমলের সমীকরণ দেখাচ্ছে সরকার। স্বামীনাথন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী  কৃষকদের প্রতি কুইন্টাল ধান পিছু ন্যুনতম মূল্য পাওয়া উচিত প্রায় ২১০০ টাকা। অবস্থান ভেদে এর দাম বাড়বে। কিন্তু সেখানে কেন্দ্র সরকার ,রাজ্য সরকার ১৭৫০ টাকা দাম নির্ধারণ করছে। কৃষক সভার দাবী কৃষকদের ধানের দাম উৎপাদন মূল্যের দেড় গুণ অর্থাৎ ২৩৪০ টাকা দিতে হবে।

বাম শাসিত কেরালা সরকার এই দামে ধান কিনছে। কৃষকসভার দাবী পাটের দাম কুইন্টাল প্রতি ৬০০০ টাকা দিতে হবে। সেখানে কেন্দ্র সরকার ৩৭০০ টাকা দাম ঘোষণা করছে।

মোদী সরকারের আমলে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে প্রায় আড়াই লক্ষ কোটি টাকার কর ছাড়  দিয়েছে। শিল্পপতিরা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে। সেই ঋণ আদায় না করে ঋণ মুকুব করতে ব্যস্ত কেন্দ্র সরকার। অথচ কৃষকের ৭০ হাজার কোটি টাকা ঋণ মুকুব করার প্রশ্নে এক কথা নাকচ করে দিচ্ছে কেন্দ্র সরকার। এ থেকেই বর্তমান কেন্দ্র সরকার কতটা কৃষক দরদী তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

মোদি সরকার ২০২২ কৃষকের আয় দু গুন বৃদ্ধি করার কথা বলছেন। অথচ কেন্দ্রীয় বাজেটে কৃষি খাতে যে ব্যয় বরাদ্দ হচ্ছে তার যে পরিমাণ; তার থেকে ২গুণ আয় বৃদ্ধি থেকে কয়েক শত যোজন দূরে।

৯ই আগস্ট এর 'জেল ভরো' অভিযানকে সফল করতে জেলায় জেলায় নির্দিষ্ট দাবির ভিত্তিতে সই সংগ্রহ অভিযানে নেমেছে বাম কৃষক সংগঠন গুলি। মোদি সরকার কতটা কৃষক দরদী তার মুখোশ খুলে দিচ্ছে।

আত্মহত্যা পথ নয়, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দাবি আদায়ের পথই বাঁচার পথ। কৃষকদের নিয়ে কৃষকদের পায়ে পা মিলিয়ে আল পথ ধরে লাল ঝান্ডা এগিয়ে চলেছে। কৃষক সভার কর্মীরা বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা পায়ে পায়ে কৃষকের কাছে গিয়ে কৃষকদের দাবি আদায়ের জন্য সই সংগ্রহ করছে। ৯ ই আগস্ট কেবল কৃষকের দাবি না;  সেখানে কৃষক, শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, ছাত্র,যুব সকলের দাবি থাকছে।

স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে কৃষকের ফসলের দাম নিশ্চিত করতে হবে। দিনমজুরদের ৩০০ টাকা মজুরিতে ২০০ দিনের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের মাসিক বেতন ন্যূনতম ১৮০০০ টাকা দিতে হবে। বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকদের ৩০০০ টাকা পেনশন সহ ১৪ দফা দাবি নিয়ে  রাস্তায় নামছে  কৃষক শ্রমিক ক্ষেতমজুর। সারা দেশে ৭২০ জেলার মধ্যে  ৪০০ এর বেশি জেলায় কৃষকরা আইন অমান্য করে জেল ভরো অভিযানে সামিল হবেন। কৃষক সভার এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছে শ্রমিক, ছাত্র, যুব, মহিলা গণ সংগঠনগুলো। লালঝাণ্ডার এই মিছিল থেকে দিল্লি সরকার লাল সংকেত পাচ্ছে।

মাত্র কয়েক মাস আগে ৬ মার্চ থেকে ১২ ই মার্চ বাণিজ্যনগরী মুম্বাই কৃষকদের বিধানসভা অভিযানের মহামিছিল দেখেছে। ১৫ হাজারের কৃষক মিছিল শুরু হলেও ৩৫ হাজারের বেশি কৃষক সামিল হোন মহামিছিলে। প্রায় ২০০ কিমি পথ পায়ে হেঁটে  সরকারের  কাছে গিয়ে দাবি আদায় করতে বেড়িয়ে পড়েছিলেন। বাণিজ্য নগরীর অলি গলি থেকে রাজপথ দেখেছে অন্নদাতার খালি পা ,ফোস্কা পড়া পা, রক্তাক্ত পা গুলো। ফসলের দাম চাইতে চাইতে এগিয়ে গেছে। ব্যস্ত থাকা বাণিজ্য নগরী সেদিন অবাক হয়ে কৃষকের দুর্দশা সরাসরি অনুভব করেছিল।

সেদিন কৃষকদের দাবি ছিল মহারাষ্ট্র সরকার যে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণ মিলছে না সেই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে।

ফসলের ন্যায্য মূল্যের দাবি পূরণ করতে হবে।

রেলপথ বা হাইওয়ে নাম করে আদিবাসীদের কাছ থেকে অরণ্য জমি যে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তা রক্ষা করতে হবে। কৃষকদের চাপের মুখে মহারাষ্ট্র সরকার ঋণ মুকুব সহ অন্যান্য দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়।

শুধুমাত্র মহারাষ্ট্র নয় উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, পাঞ্জাব,  তামিলনাড়ু সহ একের পর এক রাজ্য কৃষক বিদ্রোহ দেখেছে। চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছে সরকার ।

আগামী ৯ই আগস্ট কৃষক সভা, শ্রমিক,ক্ষেতমজুর সংগঠনগুলির ডাকে জেল ভরো অভিযান । স্বাধীনতা উত্তর পর্বে এত বড় কৃষক বিদ্রোহ দেখেনি ভারতবর্ষ।

কিন্তু কেন  ৯  আগস্ট ?

১৯৪২  সালের ৯ ই আগস্ট  ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতে ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দিন।  ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াইয়ের দিন এই ৯ ই আগস্ট।  কৃষকসভার  নেতৃত্বের কথায়,   এ দেশে   এখন কৃষক তথা  শ্রমিক ক্ষেতমজুর সাধারণ মানুষের বিপদ বিজেপি সরকার ।  এই সরকারকে উৎখাত করার করতে হবে ।পাশাপাশি এ রাজ্যের অগণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসকে  গদি থেকে উৎখাত করতে হবে।

আইন অমান্যকে কেন্দ্র করে কৃষকসভা সারা দেশে ১০ কোটি  স্বাক্ষর সংগ্রহ এবং সর্বভারতীয় স্তরে ৫ কোটি অর্থ সংগ্রহের ডাক দিয়েছে। এবং এই লক্ষ্যেই পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি স্বাক্ষর ও ৫০ লক্ষ টাকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।

৫ ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে হবে শ্রমিক- কিষান সংঘর্ষ সমাবেশ। যেখানে সারা দেশের ৫ লক্ষ কৃষক শ্রমিক ক্ষেতমজুর  সামিল হবে। বিকল্পের রাস্তা খুঁজছে কৃষক শ্রমিক। তাতেই কেন্দ্র সরকার লালসংকেত দেখছে লাল কেল্লা।

পিছোতে পিছোতে পিঠ দেওয়ালে ঠিকেছে। আর পিছোনোর জায়গা নেই। তাই শ্রমিক কৃষক গান ধরেছে ..

"তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান

কিষাণ ভাই রে,
ফসল কাটার সময় হলে কাটবে সোনার ধান
দস্যু যদি লুঠতে আসে কাটবে তাহার জান রে।

- পল্লব কুমার মৈত্র-র কলমে

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন