বাংলাদেশে ‘জান’ ও ‘জবান’র স্বাধীনতার লড়াই

বাংলাদেশে ‘জান’ ও ‘জবান’র স্বাধীনতার লড়াই
ব্লগার অভিজিৎ রায়ফাইল ছবি সংগৃহীত


এই লেখার শিরোনাম পড়ে পাঠকের মনে এই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, ‘বাংলাদেশে কী একটি এক দলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে’। কারণ এক দলীয় স্বৈরশাসন সেখানেই প্রতিষ্ঠা হয় যেখানে গণতন্ত্র বলে কিছু থাকে না। আর সেখানেই সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও কথা বলার তথা বাকস্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন করে। বর্তমানে বাংলাদেশে সেই আন্দোলনই শুরু হয়েছে। এই আন্দোলনের সূচনা হঠাৎ করে গত কয়েক দিনে হয়নি। আন্দোলন চলছে বাংলাদেশ স্বাধীনতা হওয়ার পর থেকেই। কারণ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কোনো আমলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি। যে দল যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারাই একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতার মসনদ পোক্ত করার জন্য মানুষের জীবন ও জবান দুটোই স্তব্ধ করে দিতে যা করণীয় সবই করতে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। কিন্তু এদেশের মানুষের ক্ষোভের সামনে তারা টিকতে পারেনি। ইতিহাস থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরলে উপরোক্ত কথাটি আরও বোধগম্য হবে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন দেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচন থেকেই শুরু হয় কারচুপির অভিযোগ। আসলে অভিযোগ নয় ঘটনা সত্য। ইতিহাসের সেই সত্যতার সাক্ষ্য রয়েছে। সে সময় বিরোধী দল জাসদকে (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) হারানোর জন্যই কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। সে সময়ের বাংলাদেশ ছিল ভয়াবহ আতঙ্কের। ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে কমপক্ষে ৪৯২৫টি গুপ্তহত্যা করেছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এরপর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে সব ধরণের রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বাকশাল নামে একটি মাত্র রাজনৈতিক দল করা হয়, মাত্র ৪টি সংবাদপত্র (দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য বাংলাদেশ টাইমস, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার) বাদে সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে দেশে শুরু হয় সেনাশাসন।

১৯৮১ সালের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান প্রয়াত হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। তিনি স্বৈরাচারী এরশাদ নামেই বাংলাদেশে পরিচিত। যাকে ধরা হয় বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রকে নষ্টের অন্যতম কারিগর।

১৯৭৮ সালে সেনাশাসক জিয়াউর রহমান বিরোধী দলকে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেও সেটা ছিল নামমাত্র। কারণ তখন তার দরকার ছিল একটি লোক দেখানো নির্বাচনের মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধ করা। সেই কাজটি তিনি করেছিলেন। এরপর ১৯৮২ সালে আবার সেনাশাসন শুরু হয়। ১৯৮১ সালের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান প্রয়াত হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। তিনি স্বৈরাচারী এরশাদ নামেই বাংলাদেশে পরিচিত। যাকে ধরা হয় বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রকে নষ্টের অন্যতম কারিগর। তিনিও ১৯৮৬ সালে একটি লোক দেখানো নির্বাচন করে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধ করতে চেষ্টা করেন। তার সেই নির্বাচনের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগসহ তার জোটসঙ্গীরা অংশ নেয় এবং যুদ্ধাপরাধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশও সেই নির্বাচনে অংশ নেয় এবং সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পাশেই অবস্থান নেয়। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেনি। ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বহু জীবন ও রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন হয় ১৯৯০ সালে এবং ১৯৯১ সালে সব দলের অংশগ্রহণে ইতিহাসের সবচেয়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আবারও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়। কিন্তু ‘শুরু’ আর সফল হয়নি।

বিএনপির মাথায় যে কোন উপায়ে ক্ষমতার মসনদ পোক্ত করার ভূত চেপে বসে। আর আওয়ামী লীগ সংকল্প বদ্ধ বিএনপি হটাও ক্ষমতা দখল করো। ক্ষমতা দখলের নোংরা প্রতিযোগিতায় পিষ্ঠ হয় বাংলাদেশের গণতন্ত্র। ১৯৯১ সাল থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদ হলেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি। তবে বিভিন্ন প্যারামিটারে দেশে কিছুটা হলেও গণতন্ত্র ছিল। ২০০৭ সালে ১১ জানুয়ারি আবারও ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সেনাবাহিনী ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয় এবং ২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সর্বজনগ্রাহ্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ হাটতে থাকে যে কোন মূল্যে ক্ষমতা দখলে রাখার পথে। সেই পথে হাটতে গিয়েই বর্তমানে বাংলাদেশ এমন অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতি পাড় করছে যা স্বাধীনতার পর আর কখনও দেখা যায়নি। এই যে ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই এর সাথে চলছে ‘জান’ ও ‘জবান’র স্বাধীনতার আন্দোলন।

সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের সাথে এমন প্রহসন মেনে নেয়নি। তারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করে, প্রতিবাদের অংশ হিসেবে অনলাইনকেও বেছে নেয়। আর সরকার প্রতিবাদের এই দুটি পন্থাকেই বন্ধ করতে তৎপরতা শুরু করে। যারা রাস্তায় প্রতিবাদে নেমেছে তাদের নির্মমভাবে দমন করা হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো ব্যবহার করে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলসহ অন্যান্য প্রায় সব দলই অংশ নেয়নি। যার ফলে ৩০০ সাংসদের মধ্যে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে তথা ১৫৩ আসনে কোনো ভোট হয়নি। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আসে স্বৈরাচারী এরশাদের দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলটি একই সাথে আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী এবং সংসদের বিরোধী দল। সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের সাথে এমন প্রহসন মেনে নেয়নি। তারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করে, প্রতিবাদের অংশ হিসেবে অনলাইনকেও বেছে নেয়। আর সরকার প্রতিবাদের এই দুটি পন্থাকেই বন্ধ করতে তৎপরতা শুরু করে। যারা রাস্তায় প্রতিবাদে নেমেছে তাদের নির্মমভাবে দমন করা হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলো ব্যবহার করে। আর অনলাইনে প্রতিবাদ দমাতে করা হয় ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’। এর আগে ছিল আইসিটি অ্যাক্ট যেটাকে সংস্কার করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নাম দেয়া হয়।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বৈরাচার ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে যারা কথা বলতে শুরু করে তাদের উপর যেমন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নেমে আসে তেমনি সশস্ত্র মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোর আক্রমণও শুরু হয়। এসব আক্রমণের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয় এদেশের মুক্তচিন্তক, বুদ্ধিজীবি, লেখক ও সাংবাদিকরা। ২০১৩ সালে ঢাকায় নিজের বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক রাজিব হায়দা। গণজাগরণ মঞ্চ হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারদাবিতে শুরু ঢাকার শাহবাগে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন। যেটি পরবর্তীতে সারাদেশে ছড়িয়ে পরে এবং সরকার বাধ্য হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করতে।

অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের কারণে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দ্বীপনকে একই দিন শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদ রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়। উক্ত প্রকাশকদের ‘অপরাধ’ ছিল তারা অভিজিৎ রায় ও অন্যান্য মুক্তমনা লেখকদের বই প্রকাশ করেছিল। এছাড়াও কুষ্টিয়ায় কুপিয়ে হত্যা করায় একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারকে।

২০১৫ সালে সিলেটে একই কারণে কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে। ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে বই মেলায় প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে। অভিজিৎ হত্যার ১ মাসের মাথায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে। অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশের কারণে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দ্বীপনকে একই দিন শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদ রশীদ টুটুলসহ তিনজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়। উক্ত প্রকাশকদের ‘অপরাধ’ ছিল তারা অভিজিৎ রায় ও অন্যান্য মুক্তমনা লেখকদের বই প্রকাশ করেছিল। এছাড়াও কুষ্টিয়ায় কুপিয়ে হত্যা করায় একজন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারকে। তার সাথে থাকা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুজ্জামানকেও হত্যার জন্য কোপানো হয় কিন্তু তিনি ঘটনাক্রমে বেঁচে যান। কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক গত বলে আর কিছু রাখা হয়নি। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। এছাড়াও আর অসংখ্যা ঘটনা রয়েছে। গোটা বাংলাদেশ মুক্তচিন্তক, বুদ্ধিজীবি, লেখক ও সাংবাদিকদের জন্য নরকে পরিণত হয়ে যায়। অসংখ্য মুক্তচিন্তক, বুদ্ধিজীবি, লেখক ও সাংবাদিক দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এতো ধর্মীয় উগ্রবাদীদের তাÐবের কিছু বর্ণনা মাত্র। অন্যদিকে রয়েছে তথাকথিত ধর্মাবমাননার অভিযোগে সাম্প্রদায়িক হামলা, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জ¦ালিয়ে দেয়া, পিটিয়ে হত্যা করা। এই ঘটনাগুলো এখনও ঘটছে। এসব ঘটনায় সরকার নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

একদিকে জঙ্গীদের হামলা অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বড় শিকারও উপরোক্ত মুক্তচিন্তক, বুদ্ধিজীবি, লেখক ও সাংবাদিকরা। বাংলাদেশে যখন আইসিটি আইন তৈরি করা হয় তখন সেই আইনে ৫৭ ধারা নিয়ে সব মহল থেকে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। সিভিল সোসাইটির পক্ষ থেকে, সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পাদকদের পক্ষ থেকে, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনগুলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক মহল থেকে, বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে আইনটি নিয়ে প্রবল আপত্তি তোলা হয়। সরকার সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে আইসিটি আইন করে। এরপর চলমান প্রতিবাদের ফলে সরকার কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখিয়ে আইসিটি আইনকে সংশোধন করে তৈরি করে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’। নমনীয়তা দেখিয়ে এই নতুন আইন করা হলেও আইনিট পূর্বের আইসিটি অ্যাক্টের চেয়ে আরও ভয়াবহ কালাকানুন। এই আইনের মূল টার্গেট মুক্তচিন্তক, বুদ্ধিজীবি, লেখক ও সাংবাদিকরা।

সামান্য ফেইসবুক পোস্টের কারণেও কেউ বা কোনো কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে তার/তাদের সম্মানহানি হয়েছে তাহলেও এই আইনে মামলা করা যাবে। যার শাস্তি ১৪ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারদণ্ড কিম্বা অর্থদণ্ড কিম্বা উভয়ই হতে পারে। এই আইনে কৃত অপরাধ জামিনযোগ্য নয়। এই আইনটি সব চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল।

এই আইন মূলত একটি বায়বীয় আইন। সামান্য ফেইসবুক পোস্টের কারণেও কেউ বা কোনো কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে তার/তাদের সম্মানহানি হয়েছে তাহলেও এই আইনে মামলা করা যাবে। যার শাস্তি ১৪ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারদণ্ড কিম্বা অর্থদণ্ড কিম্বা উভয়ই হতে পারে। এই আইনে কৃত অপরাধ জামিনযোগ্য নয়। এই আইনটি সব চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল। সরকারের কিম্বা দলের যে কোনো নেতা কিম্বা সর্বোচ্চ ব্যক্তিকে নিয়ে সমালোচনা করে কেউ অনলাইনে কিছু বলে আর সেটা যদি কারো মনে হয় যে সরকার, দল কিম্বা দলীয় নেতা কিম্বা সর্বোচ্চ ব্যক্তির সম্মানহানী হয়েছে তাহলেই মামলা করে দিতে পারে। সম্প্রতি এই আইনের বলি হওয়া কিছু ঘটনা উল্লেখ করলে বুঝা সহজ হবে। যেমন করোনাকালে গত বোরোধানের মৌসূমে যখন ধান কাটার জন্য কৃষাণের সংকট দেখা দেয় তখন সরকার কৃষকের ধান কেটে দেয়ার জন্য তার দলের লোকজনে উৎসাহিত করে। সেই উৎসাহ থেকে এক সংসদ সদস্য তার দলবল নিয়ে পুলিশ পাহাড়ায় এক কৃষকের কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করে। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পরে। ছড়িয়ে পরা ভিডিও শেয়ার করার দায়ে ঢাকার নারায়ণগঞ্জে এক সাংবাদিকের নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দেয়া হয় এবং তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। গত বছর জুনে বর্তমান সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর পর ছোট একটা ফেইসবুক পোস্টের কারণে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সিরাজুম মুনিরার নামে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দেয়া হয় এবং গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকেও বহিষ্কার করা হয়। একই কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তিনিও গ্রেফতার হন। এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সব চেয়ে আলোচিত ও নিমর্ম ঘটনা হলো গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে লেখক মোশতাক আহমদের মৃত্যু। তিনি ২৯৫ দিন কারাগারে ছিলেন, ৬ বার তার জামিন আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তার অপরাধ ছিল ফেইসবুকে একটি কার্টুন শেয়ার করা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সব চেয়ে আলোচিত ও নিমর্ম ঘটনা হলো গত ২৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে লেখক মোশতাক আহমদের মৃত্যু। তিনি ২৯৫ দিন কারাগারে ছিলেন, ৬ বার তার জামিন আবেদন বাতিল করা হয়েছে। তার অপরাধ ছিল ফেইসবুকে একটি কার্টুন শেয়ার করা। যেটা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলে তার নামে মামলা করা হয় এবং তিনি বিনাবিচারে কারাগারে মারা যান। একই আইনে কার্টুন আঁকার দায়ে কার্টুনিস্ট আহাম্মেদ কিশোরকে ৩০০ দিন কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়। তিনি গত ৩ তারিখে ৬ মাসের জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এমন অসংখ্য ঘটনা বাংলাদেশে ঘটছে।

কারাগারে লেখক মোশতাক হত্যার প্রতিবাদে বর্তমানে সারাদেশে এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি উঠেছে। এবং সাথে সাথে বেড়েছে সরকারের দমন-পীড়ন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগে লেখক মোশতাক হত্যার প্রতিবাদে মশাল মিছিল থেকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ৬ ছাত্র নেতা ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের এক নেতাকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশকে হত্যাচেষ্টা মামলা দেয়া হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি আদালতে পেশ করে পুলিশ আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করলে আদালত সেটা নাকচ করে দিয়ে জেলগেইটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমোদন দিয়ে ৩ মার্চ শুনানির দিন ধার্য্য করেন। কিন্তু ৩ মার্চ তাদের জামিন নামঞ্জুর করে দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে আদালত প্রাঙ্গনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করলে সেখান থেকে সংগঠনটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ আরও ৭ জনকে পুলিশ আটক করে। অবশ্য কিছু সময় পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। একই দাবিতে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করলে পুলিশ তাদের উপর চড়াও হয়। তাদেরকে সমাবেশ করতে দেয়নি। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ বাধলে পুলিশ জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে ঢুকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের পিটিয়ে আহত করে এবং বিক্ষোভ সমাবেশ পণ্ডু করে দেয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি বিরাজমান স্বাধীনতার পর কখনও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা পরিস্থিতি কতটা নাজুক সেটা উপরোক্ত বর্ণনায় ক্রিয়দাংশ বর্ণানা করা সম্ভব হয়নি। বলতে গেলে বর্ণনাতীত। উপরোক্ত ঘটনা বর্ণনা করে লেখার দায়ে এই লেখকও যে কোনো সময় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আটক হতে পারে। সরকার যদি মনে করে যে দেশের বাইরের একটি সংবাদমাধ্যমে লেখার মাধ্যমে এই লেখক রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে কিম্বা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে তাহলেই খেল খতম।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in