বাংলাদেশে মৌলবাদের রমরমা রাজনীতি
গ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

বাংলাদেশে মৌলবাদের রমরমা রাজনীতি

পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদ একে অপরের পরিপূরক এবং এই দুটি মতবাদ গলাগলি করে চলে। তবে এই দুই মানবতা বিরোধী মতবাদ আবার নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষের সৃষ্টি করে। এই সংঘর্ষকে কখনই তাদের মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ভাবার কারণ নেই। এটা তাদের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব। দুটো মতবাদই প্রগতি বিরোধী, মানব সভ্যতার উৎকর্ষতার বিরোধী। এই দুই মতবাদের মিলন ও দ্বন্দ্বের অন্বেষন করতে দূর অতীতে যাওয়ার বেশি প্রয়োজন নেই সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ থেকেই উভয়ের মধুর মিলনে চিত্র স্পষ্ট হয়।

মৌলবাদ ও পুঁজিবাদী রাজনীতির এই গলাগলি মিলনের দৃষ্টান্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন রয়েছে তেমনি বাংলাদেশ ও উপমহাদেশেও রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে এবং উপমহাদেশের মৌলবাদী রাজনীতি পুঁজিবাদী দলগুলোর উপর ভর করে এমন অবস্থানে পৌঁছেছে যে রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মৌলবাদের তুষ্টি লাভ করা রাজনৈতিক দলগুলোর বড় লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত প্রায় ১০ বছর ধরে বাংলাদেশে মৌলবাদী রাজনীতির রমরমা অবস্থা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ, অর্থনীতির পলিসি মেকিং, শিক্ষানীতি প্রণয়নসহ সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও মৌলবাদী শক্তিগুলো নীতি নির্ধারণী ভূমিকা পালন করছে। যার ফল আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। সরকার শিক্ষানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে মৌলবাদী দলগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রায় বর্জন করে ফেলেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে হিন্দু লেখকদের লেখা বাদ দেয়া হচ্ছে। সরকার মূলধারা শিক্ষাব্যবস্থার সমমানে আধুনিক শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন সত্ত্বেও বৃহৎ ধর্মের অনুসারীদের শিক্ষাসনদের সমমান দিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদেরকে মূলধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে একাত্ব না করেই সমমান দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে এর ফলে তারা বিরাট একটা অংশকে স্বীকৃতি দিয়ে মূলধারায় একীভূত করতে চেষ্টা করছে কিন্তু তাদের এই দাবিও পুরো ঠিক নয়। কারণ যেখানে তাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ই যুগের চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন সেখানে তাদেরকে কেবল সনদগত স্বীকৃতি দিলেও আখের এর ফল পাওয়া যাবে না। তথাপি সরকার কেবল বৃহৎ ধর্মীয় সংগঠন ও ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের সহানুভূতি লাভের জন্য এবং রাজনৈতিক স্বার্থে তাদের তোষণ করে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে। সে সময় বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে আপত্তি করা হলেও সরকার কান দেয়নি। সরকার এই কাজটি করেছিল রাজনৈতিক স্বার্থে। যদিও কওমি সনদের স্বীকৃতির কাজটি ইতিবাচক। কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে সরকার যেটা করেছে তাতে রাজনৈতিক স্বার্থের আশ্রয় নিয়েছে।

বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির পুনর্বাসন করেছিল সেনাশাসক জিয়াউর রহমান। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ৩৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে মৌলবাদী রাজনীতির পক্ষ উন্মুক্ত করেন। এরপর মৌলবাদের জয় রথকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রাজনীতিতে ও দেশের সার্বিক পলিসি মেকিং-এ তারা অন্যতম নিয়ামক শক্তি রূপে আর্ভিভাব হয়। ১৯৮৬ সালে মৌলবাদী রাজনীতি স্বৈরশাসক এরশাদের পাতানো নির্বাচনকে বৈধতা দানের মাধ্যমে দেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের বাধা সৃষ্টি করে। এর ১৯৮৮ সালে ৮ম সংশোধনীর মাধ্যমে সেকুলার সংবিধানের খতনা করে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি লাভ ছিল তাদের বিশাল বড় বিজয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনেও মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি সংসদের সরকার দলের আসন লাভ করে তথা দেশ পরিচালনায় অংশীদারী হয়ে উঠে। অথচ পাকিস্তান আমলেও সেকুলার রাজনীতির সামনে মৌলবাদী রাজনীতি ছিল কোণঠাসা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মৌলবাদী রাজনীতি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং তারা ছিল পরাজিত শক্তি। মাত্র ২০ বছরের মাথায় তারা হয়ে উঠে স্বাধীন সেকুলার দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। রাষ্ট্র পরিচলনায় তাদের মতাদর্শ নীতি নির্ধারণ করতে শুরু করে।

বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির দুটি অংশ রয়েছে। একটি রাজনৈতিক মৌলবাদী শক্তি অন্যটি অরাজনৈতিক মৌলবাদী শক্তি। তবে এই দুই শক্তিই রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক মৌলবাদী শক্তি জনগণের কাছে ভোটের রাজনীতিতে তেমন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মমতকে উপজীব্য করে তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে তাদের গ্রহণ যোগ্যতা জাতীয়তাবাদী ‘তথাকথিত সেকুলার’ দলগুলোর মতো না। এজন্য তারা এককভাবে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তারা তথাকথিত সেকুলার দলগুলোর সাথে জোট করে ক্ষমতায় আসে। রাজনীতির মাঠে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সামর্থ্য না থাকলেও কোন দলের ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা থাকে। এই গুরুত্ব আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনো দলই এড়িয়ে যেতে পারেনি, পারে না। তারা মৌলবাদী রাজনীতির কবল থেকে বের হতে চেষ্টাও করে না। তাই বড় দুটি দলই ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে জোট গঠন করে। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের জোটেই রয়েছে ৭০ শতাংশ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে বিএনপির সাথে আছে বৃহৎ মৌলবাদী শক্তি জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতে ইসলামীর জন্য বিএনপিকে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হলেও তাদের মধ্যকার সম্পর্ক টুটেনি।

দ্বিতীয়, অরাজনৈতিক মৌলবাদী শক্তিগুলো সরাসরি রাজনীতি করে না কিন্তু রাজনীতিতে আধ্যত্মিক গুরুর মতো তাদের ভূমিকা সব সময়ই থাকে। এই ভূমিকার শুরুও হঠাৎ করে হয়নি। তবে বর্তমানে যেভাবে চলছে অতীতে কখনই এমন দেখা যায়নি। কথিত ধর্মাবমাননার অভিযোগ ও ‘ইসলাম রক্ষার’ নামে ২০১০ সালে গঠিত হয় সব চেয়ে বড় অরাজনৈতিক ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। এই সংগঠনটিই বর্তমানে সব চেয়ে বড় ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু কেতাবে অরাজনৈতিক সংগঠন হলেও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় আরোহণের ক্ষেত্রে নীতি নির্ধারণী সংগঠনের পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালে কথিত নাস্তিক, ব্লাগ ও ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদের নামে এবং বিচার দাবিতে ১৩ দফা দাবি নিয়ে হেফাজতে ইসলাম ঢাকার অভিমুখে লংমার্চ শুরু করে। এই লংমার্চে পানি খাইয়ে, নাস্তা করিয়ে এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং বিএনপি সহযোগিতা করেছিল। সরকার ২০১৩ সালের ৪ ও ৫ মার্চ দিনভর ঢাকায় হেফাজতের তাণ্ডব শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে। ওই দু’দিন ছিল সারা ঢাকার জন্য ভয়ানক সময়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয় হেফাজত কর্মীরা। এছাড়াও সারা ঢাকায় গাছ কেটে সড়ক অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে, এটিএম মেশিন ভেঙে টাকা লুটের মতো ধ্বংস যজ্ঞ শুরু করে। সরকার ৫ মে রাতে যে কঠোরতা নিয়ে এই সহিংসতা দমন করেছিল এর মাত্র কয়েক দিন পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তার চাইতেও অধিক দরদ নিয়ে হেফাজতে ইসলামকে কাছে টেনে নেয়। নানা রকম সুযোগ সুবিধা দিয়ে, তাদের অনেক দাবিও প্রতি নমনীয়তা দেখিয়ে মৌলবাদী শক্তির কাছে নত-স্বীকার করে। এর ফলে ১৯৮৬ সালে যেমন জামায়াতে ইসলামী দেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণের দিক থেকে পিছিয়ে দিয়েছিল হেফাজতও একইভাবে ২০১৪ সালের ভোটার বিহীন নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনতার অনুভূতি নিয়ে ধর্ম রক্ষার খেলা খেলে দেশ থেকে গণতন্ত্র তিরোহিত করতে সহযোগী হয়। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলাম যে ১৩ দফা দাবি পেশ করেছিল তাদের সরকারের গৃহীত নারী নীতির বিরোধীতা ছিল। ২০১০ সালের সেকুলার শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে তাদের দাবি ছিল এবং ধর্মাবমাননার জন্য ব্লাসফেমি আইনের দাবি ছিল। যার সর্ব্বোচ্চ শাস্তির দাবি ছিল মৃত্যুদণ্ড। বর্তমান সরকার প্রধান সে সময় সংবাদমাধ্যমে হেফাজতের এসব দাবি মানার বিষয়টি নাকচ করলেও পরে ঠিকই ক্রমে এবং ‘ধীরে চলো’ নীতিতে দাবিগুলো অনেকাংশে মেনে নিয়েছে। যেমন ২০১৭ সালে জাতীয় পাঠ্যক্রম থেকে হিন্দু লেখকদের লেখা বাদ দেয়া, মূলধারার শিক্ষার সাথে সমন্বয় না করে ও সেকেলে পাঠ্যক্রমের উপর পরিচালিত কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দানে শিক্ষাবিদদের মতামত উপেক্ষা করা, হেফাজতের সাবেক আমির আল্লামা আহমদ শফীর সাথে সাক্ষাৎ করে তার দোয়া নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করা, হেফাজতে ইসলাম কর্তৃক কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে কওমি জননী উপাধি দেয়া ইত্যাদি কর্মকাণ্ড থেকেই ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠনের রাজনৈতিক সত্ত্বা হিসেবে আর্ভিভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। এছাড়ও ২০১৭ সালে হেফাজতের ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত ন্যায় বিচারের প্রতীক থেমিসের ভাস্কর্য অপসরণ করার মতো ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সেকুলার ভাবমূর্তির বিরোধী বলেই প্রতীয়মান।

সরকার ২০১৩ সালে হেফাজতের ধর্মাবমাননার বিরুদ্ধে আইন করার বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের যে দাবি ছিল সেটা নাকচ করে দিলেও ২০১৮ সালে প্রণিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার’ বিষয়ে বেশ কিছু আইন তৈরি করে। যে আইনগুলোর ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে ইদানীং। ২০১২ সালে ইসলামের অবমাননার নামে কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে স্থানীয় জনগণের তা-ব্য চলে। যার বিচার এখনও হয়নি। একইভাবে ২০১৬ সালে নাসিরনগরে ধর্মাবমাননার অভিযোগে স্থানীয় হিন্দুদের উপর নেমে আসে উগ্রবাদী হামলা। ২০১৭ সালে রংপুরের পাগলাপীরেও একই ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালে ভোলার বোরহানউদ্দীনেও স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর তওহীদি জনতার ব্যানারে মিছিল থেকে এক যোগে হামলা করা হয়। সেখানে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন মারাও যায়। সম্প্রতি একই ধর্মাবমাননার অভিযোগে গত কয়েক সপ্তাহে সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছেন। অসংখ্য মানুষের নামে মামলা হয়েছে এবং অনেকে আটকও হয়েছে। রংপুরে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে কুরআন অবমাননার দায়ে পিটিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কুমিল্লায় ফেইসবুকে ধর্মাবমাননার অভিযোগে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও কয়েকটি বাড়িতে হামলা কয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি এরূপ ধর্মাবমাননার অভিযোগ এনে বিধ্বংসী তাণ্ডবের ঘটান অনেকটা ডালভাতে পরিণত হয়েছে।

এই যে ধর্মাবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে আগুন ধরিয়ে হত্যা, বসতবাড়িতে হামলা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, থানায় মামলা করা এসব ঘটনা হঠাৎ করেই হচ্ছে বিষয়টা এমন নয়। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই মৌলবাদী শক্তির সুপ্ত বিকাশ হতে হতে এবং রাজনৈতিক আধিপত্য সৃষ্টির মাধ্যমে আজকের এই বিস্ফোরণ দশার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে ধর্মাবমাননার অভিযোগ এনে এর আগেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা, কুপিয়ে হত্যা, পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে। এবার যেটা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ নতুন একটা টেন্ড চালু হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত ফেইসবুক আইডিতে লেখার দায়ে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করার জন্য বিভাগ থেকে সব শিক্ষকরা মিলে মিটিং করে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সুপারিশ করেছে। বাংলাদেশে ইতোপূর্বে ধর্মাবমাননার অভিযোগে বিভাগ থেকে শিক্ষকরা মিটিং করে শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করতে সুপারিশ করেছে এমন ঘটনা বিরল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অতীতে কখনই ধর্মাবমাননাকে কেন্দ্র করে কখনই এতো সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়নি। এই যে একটা বহিষ্কারের সংস্কৃতি সৃষ্টি হচ্ছে এর ফল খুবই খারাপ হবে। একবার একটা টেন্ড চালু হলে এবং সেটার চর্চার বৃহৎ সংখ্যক মানুষের মধ্যে শুরু হলে সমাজে তা বৈধতা পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে সেটা আইনেও পরিণত হয়। বিএনপির সময়ে যখন র‌্যাব গঠন করা হচ্ছিল তখন সারা বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এমন একটা বাহিনী গঠনের বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু সে সময় ক্ষমতাসীন দল সেটা কানে তুলেনি। এই র‌্যাব দিয়ে পরে তারাই বেশি নিপীড়নের শিকার হয়েছে। একইভাবে বর্তমানে রাজনৈতিক দলের সমালোচনা, কোন নেতার সমালোচনা, ক্ষমতাসীন দলের কোন এমপি-মন্ত্রীর সমালোচনা, প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা, ধর্মাবমাননার অভিযোগ ইত্যাদি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেভাবে বহিষ্কারের রীতি চালু হচ্ছে সেটাও এক সময় বুমেরাং হবে। পাকিস্তানে ‘ইসলাম রক্ষার নাম করে’ সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলিমদের দাবির মুখে ‘ব্লাসফেমি’ আইন তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে এই আইনের বড় শিকার দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি সম্প্রদায়। এমনকি ২০১১ সালে দেহরক্ষীর হাতে একজন পার্লামেন্ট সদস্যকেও প্রাণ দিতে হয়েছে। পাকিস্তানে এই আইনে ভয়াবহ প্রয়োগ নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের মন রক্ষার জন্য কোনো সরকারই আইনটির পরিবর্তন করতে চায়নি। এখন এর শিকার দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিরাই। এছাড়াও আহমাদিয়া, শিয়া, খ্রিস্টান ও হিন্দুরাও এই আইনের ভয়াবহতার শিকার।

বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্মাবমাননার অভিযোগ এনে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, সরকার, প্রধানমন্ত্রী কিম্বা সরকার ‘দলীয় বিশিষ্ট্’ ব্যক্তির সমালোচনায় দায়ে যে বহিষ্কারের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে এর ফলও মারাত্মক হবে। একজন শিক্ষার্থী ভুল করে থাকলে তার বিচারের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে। সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট করলে তার জন্যও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে কিন্তু সেটা না করে ফেইসবুকে পোস্ট করার কারণে যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের টেন্ড শুরু হয়েছে এটার নেতিবাচক ফল অবশ্যই ভোগ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে ফেইসবুকে পোস্ট করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্যের বিশেষ ক্ষমতা বলে বহিষ্কার করা হচ্ছে। ক্ষমতার গণেশ যখন উল্টে যাবে তখন আবার নতুন দলের উপাচার্য আসবেন। তখন তিনিও এই বিশেষ ক্ষমতার চর্চা ধরে রাখতে বাধ্য হবেন। কারণ যে টেন্ড চালু হয় সেটা ক্ষমতার আজ্ঞাবহ ব্যক্তির পক্ষে ভাঙা সম্ভব হয় না। তথাকথিত ধর্মাবমাননার দায়ে এই যে বহিষ্কার এটা স্পষ্টতই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও মৌলবাদের করাল থাবার স্পষ্ট আভাস। একদিকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির পলিসি মেকার রূপে মৌলবাদের সফলতা অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্ত চিন্তার পাদপীঠেও মৌলবাদের ভয়াল থাবা। সব মিলেয়ে মৌলবাদের জয় রথ দুর্দান্ত প্রতাপে চলমান; কোণঠাসা গণতন্ত্র, চিন্তা, বাক ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিলুপ্ত প্রায়।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in