‘হু’ কে? আমরা ওসব হু ফু জানিনা। আমরা করোনা বিশেষজ্ঞ। একদিকে দেশে বিদেশে পাল্লা দিয়ে করোনা ভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা বিশেষজ্ঞর সংখ্যা। আর এই সময়েই শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নয়, রাস্তা ঘাটে বাসে ট্রেনে স্বঘোষিত এই করোনা বিশেষজ্ঞদের হাজারো নিদানের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃত সতর্কতা। গুলিয়ে যাচ্ছে কী করা উচিৎ আর কী করা উচিৎ নয়। আতঙ্ক নয়, সতর্ক থাকুন তাই এই কয়েকদিনে অনেকটাই সতর্ক নয়, আতঙ্কে থাকুন-এ বদলে গেছে।

করোনা সংক্রমণ রুখতে কী করা উচিৎ আর কী করা উচিৎ নয় এই বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী বলছে গুলি মারুন তাতে। আপনি বাড়ির পাশে কয়লা খুঁজে কপালে টিপ পরুন, কিংবা ১৫ মিনিট রোদ্দুরে শুয়ে থাকুন, গোমূত্র খান অথবা থালা বাটি বাজান গোছের নিদানে ভাইরাস সংক্রমণ কতটা প্রতিরোধ করা যাবে সে প্রশ্নে মারো গুলি। কেউ কেউ আবার লিখে দিচ্ছেন ১৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাস মরে যায়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসের চরিত্র বদল নিয়ে সন্দিহান এবং তাদের বিশেষজ্ঞরা বারবার জানাচ্ছেন সময় সময় আমরা যেরকম জানতে পারবো আপনাদের জানাবো। আমার মনে হলেই বলে দেব। যেখানে যা শুনবো ফেসবুকের দেওয়ালে এসে উগরে দেবো। ব্যাস। তাহলেই আমি একমাত্র করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতন ব্যক্তি। মহাপুরুষ।

এই বিপর্যয়ের সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আরও কিছু কথা। যার মধ্যে প্রধান – ‘এই সময় রাজনীতি করবেন না প্লীজ’। সঠিক কথা। এই বিপর্যয়ের সময়ে রাজনীতি করা একদম উচিৎ নয়। তা সে মধ্যপ্রদেশে যতই বিধায়ক কেনাবেচা করে নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়া হোক না কেন। এই সময়ে রাজনীতি করা একদম উচিৎ নয়। তাইতো করোনা প্রতিরোধে কেরল সরকারের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন। এই সময় একদম রাজনীতি নয়। তাইতো ‘জনতা কার্ফু’ যে কোনো মূল্যে সফল করে তুলতে, একটা জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বদলে দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় প্রচার। প্রশিক্ষিত বাহিনী দিয়ে ‘কেমিক্যাল গ্যাস’-এর গুজব ছড়িয়ে মানুষকে আরও আতঙ্কিত করা। যার কোনো ভিত্তি নেই। পুরোটাই গুজব। অথচ সরকার এই ভাইরাস প্রতিরোধে কতগুলো ল্যাব খুললো বা কত মাস্ক বিতরণ করলো, কিংবা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত কী ব্যবস্থা নিলো তার কোনো তথ্য নেই, বিবৃতি নেই। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম বলছে বিভিন্ন দেশে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ৩০ কোটি শিশু অভুক্ত থাকছে। আমাদের দেশের সরকার বন্ধ হয়ে থাকা স্কুলের শিশুদের মিড ডে মিলের জন্য কী ব্যবস্থা করলো? ব্যতিক্রমী কেরালা ছাড়া অন্যকিছু তো এখনও নজরে পড়েনি। কিন্তু এসব নিয়ে প্রশ্ন করলেই শুনতে হবে – ‘এই সময় রাজনীতি করবেন না প্লিজ’।

কিন্তু মানুষকে বোঝাবে কে? এই ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে বার বার ভালো করে হাত ধুয়ে নেবার কথা, সংক্রমিত মানুষের জন্য আইসোলেশনের কথা, জনসমাগম এড়িয়ে চলার কথা তো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে। কখন কীভাবে মাস্ক ব্যবহার করবেন, হাঁচি, কাশির সময় কীভাবে মুখ ঢেকে রাখবেন, জ্বর, কাশি, সর্দি হলে অন্যদের থেকে দূরে থাকবেন, দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন এই সবই তো ওয়েবসাইটে লিখে দিচ্ছে। সেটা ১৪ ঘণ্টার জন্য নয়। থালা বাটি বাজিয়েও নয়। সেটা বেশ কয়েকদিনের জন্য।  

এই সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি থালা বাটি বাজাতে পারেন, কারোর পিঠ চাপড়াতে পারেন, কাউকে মহান করে তুলে ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে পারেন। আপনার বিশ্বাস, আপনার ধর্ম – সব আপনার নিজের নিজের। কী করবেন সেটা একান্তই আপনার ভাবনা। কিন্তু দোহাই। এ লড়াইটা একান্তভাবেই বিজ্ঞানের। বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের পথেই লড়াইটা লড়তে দিন। মাঝে মাঝে একটু সময় পেলে https://www.who.int/emergencies/diseases/novel-coronavirus-2019 -এই ওয়েবসাইটটা খুলে দেখুন। আপনার অনেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখানেই পাবেন। আপনাকে সোশ্যাল মিডিয়ায় হাতড়ে মরতে হবেনা। থালা বাসন বাজিয়েও না। গুজবে নয়। খবরে থাকুন। গুজব ছড়াবেন না। অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক হোন। ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের লড়াই প্রতি মুহূর্তের। এই লড়াইতেও ভাইরাসকে পরাস্ত হতেই হবে। আজ, নাহয় কাল।

  

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন