এতদিনে প্রায় সকলেই জেনে গেছেন আফরাজুলের খুনের পেছনে কোনও ‘লাভ জিহাদ’-এর গল্প ছিলোনা। অবশ্য শম্ভুনাথ রেগারই যে তাঁকে খুন করেছেন সেটা খোদ শম্ভুনাথই সকলকে জানিয়েছেন।

 নাবালক ভাইপোকে দিয়ে ভিডিও শ্যুট করিয়ে গর্বের সঙ্গে সেটা প্রচারও করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেই ভিডিয়োতে শম্ভুনাথ যা যা বলেছেন তার সবটাই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বয়ান। সুতরাং আফরাজুলের মৃত্যুর পেছনে আসল কারণ কী তা যদিও আদালতের বিচারাধীন বিষয়, তবু প্রাথমিক একটা ধারণা করাই যায়। আসলে আখলাখ, জুনেইদ, পেহলু খান অথবা হালের আফরাজুল – এঁদের কাউকে মেরে ফেলার জন্যই বিশেষ কোনও কারণ হয়তো লাগেনা। কোনও এক গোষ্ঠীর বা বকলমে কোনও সংগঠনের মনে হওয়া টুকুই যথেষ্ট।

আফরাজুলকে কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে এমন একটা সময় যখন গুজরাটে নির্বাচন চলছে। যে নির্বাচনে যথেষ্টই কোণঠাসা অবস্থায় ছিলো বিজেপি। যে মাটিতে হয়তো আরও একটা ২০০২-এর ফেব্রুয়ারি ফিরিয়ে আনা সম্ভব ছিলো না। সেবারও বিধানসভা নির্বাচনের আগে যথেষ্ট কোণঠাসা অবস্থাতেই ছিলো বিজেপি। পরাজয় ঘটেছিলো বিধানসভা নির্বাচনের আগে একাধিক উপনির্বাচনে। প্রমাদ গোণাই স্বাভাবিক। এবং সেই আশঙ্কা থেকে জয় সুনিশ্চিত করার জন্যই ২০০২-এর গুজরাট দাঙ্গা। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের সেই খেলায় হেরে গেছিলো মানুষ। মনুষ্যত্ব।

আসলে আফরাজুল বা জুনেইদরা এক বিরাট লক্ষ্যের উপলক্ষ্য মাত্র। যে লক্ষ্যে ঠিক প্রতিটা ভোটের আগে উপলক্ষ্য হয় রামমন্দির, উপলক্ষ্য হয় সীমান্তের সংঘর্ষ, অথবা উপলক্ষ্য হয় সন্ত্রাসবাদ। ঠিক যে কারণে আদালতের মাথায় উড়িয়ে দেওয়া হয় গেরুয়া পতাকা, খুনী শম্ভুনাথের আদালতের খরচার জন্য রাতারাতি উঠে যায় কয়েকলক্ষ টাকা। একইভাবে তো খুনী নাথুরাম গডসের মূর্তির জন্যও টাকা উঠেছে। বার্তা পাঠানো একশ্রেণীর মানুষকে, সাবধান, হুঁশিয়ার। আমরাই নিয়ন্ত্রক, আমরাই নির্ণায়ক। ঘৃণা এবং হিংসার এই বার্তার আড়ালে ঢেকে দেওয়া দেশের আসল আসল সমস্যার ক্ষেত্রগুলোকে। ধর্মের কারবারিরা ভালো করেই জানেন, একমাত্র ধর্ম দিয়েই পেটের খিদে ভুলিয়ে ভাইয়ের বুকে ছুরি বসাতে শেখানো যায়। সেই ধর্মের প্রভাবেই তো প্রাক্তন বিচারপতি লুটিয়ে পড়েন ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত জেলে থাকা আশারাম বাপুর পায়ে। দোষ করে সাজা পাওয়া বাবা রাম রহিম কৃত্রিম দাঙ্গা লাগিয়ে দেন সাধারণ মানুষকে বলি চড়িয়ে। আক্রান্ত এবং আক্রমণকারী – এঁরা সবাই কিন্তু সাধারণ মানুষ। যারা ঠাণ্ডাঘরে বসে দাঙ্গার ব্লু প্রিন্ট তৈরি করেন – তাদের আর যাই হোক পেটে গামছা বেঁধে দুবেলা দুমুঠো ভাতের চিন্তা করতে হয়না। মাথায় ছাদের চিন্তা করতে হয়না। পরণের পোশাকের চিন্তা করতে হয়না। আর দাঙ্গাকারিরা দাঙ্গা করতে করতে কোনও দোকান লুট করার সময় বাড়িতে ফোন করে বাবার প্যান্টের কোমরের মাপ জানতে যায়। হ্যাঁ, জেনে রাখা ভালো ২০০২ সালে গুজরাটে এরকমও হয়েছিলো।

সংকটটা সভ্যতার, নাকি মানুষের তা বলবেন সমাজতাত্ত্বিকরা। ময়ূর কখন কাঁদবে, আর সেই জল খেয়ে ময়ূরী গর্ভবতী হবে, কিংবা গণেশের মাথায় হাতির মাথা বসানোই প্রথম প্লাস্টিক সার্জারি গোছের উদ্ভট কিছু তথ্য গেলানোর যে মেকানিজম দিবারাত্র চষে বেড়াচ্ছে দেশের প্রান্ত থেকে প্রান্তরে, সোশ্যাল মিডিয়ার অলিগলিতে, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে আফরাজুলদের খুন সেই মেকানিজমেরই অংশবিশেষ।

আগামীকাল গুজরাট এবং হিমাচল প্রদেশের ভোটের ফলাফল প্রকাশিত হবে। এই ভোটের ফলাফলের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছে। আক্রমণ আরও ধারালো হবে নাকি কিছুটা স্তিমিত, সেটা কাল থেকেই শুরু হবে, নাকি আরও অপেক্ষা করা হবে – সেটা কাল বিকেলের আগে বোঝা যাবে না এবং একমাত্র ফলাফলের ওপরেই নির্ভর করবে পুরো বিষয়টা। বারুদের স্তূপ তৈরি করা আছে। তিলে তিলে বিষ ছড়িয়ে। লঙ্কাকাণ্ড বাধানোর জন্য হনুমানরাও তৈরি। বালিতে মুখ গুঁজে ঝড় এড়ানোর জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করবো কিনা সেটাও বোধহয় এখনই ভেবে ফেলার সময় এসেছে।

জনপ্রিয় খবর

  • এই সপ্তাহের এর

  • এই মাস এর

  • সর্বকালীন